Image description

ইরানকে পরাজয় মেনে নেয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে, ‘পরাজয় মেনে নাও, না হলে আরও শক্তভাবে আঘাত করা হবে’। দৃশ্যত, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে বা যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প উঠেপড়ে লেগেছেন। তিনি এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের মাধ্যমে তা পৌঁছে যাওয়ার কথা ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে। ট্রাম্পের প্রস্তাব হাতে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক, ইরান কিন্তু যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ফিরতে অস্বীকার করেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার। এরই মধ্যে আরেক খবর প্রকাশ করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

তাতে বলা হয়েছে, ইরানকে জিরান-২ মডেলের আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করছে রাশিয়া। তবে রাশিয়া এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধের ময়দানে কেউ আসলে এমন অভিযোগ স্বীকার করতে চায় না। এ এক ‘ওপেন সিক্রেট’ গোপন খেলা। ইরান এখনো যুদ্ধ বন্ধে বা আলোচনায় বসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। তবে কোনো কোনো মিডিয়ায় খবর প্রকাশ পেয়েছে যে, তারা যুদ্ধবিরতির জন্য ৫টি শর্ত দিয়েছে। এগুলো ট্রাম্পের ১৫ দফার ঠিক উল্টো। ফলে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি কতোদূর এগুবে তা নিয়ে নিশ্চিত সন্দেহ করা যায়। ইরান যে মানসিকতা দেখাচ্ছে, সেখানে তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলেই মনে হয়। তবে কি এটা বুঝতে পেরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন! তা নাহলে ইরানকে পরাজয় স্বীকার করে নেয়ার জন্য এত চাপ কেন!

অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এই যুদ্ধে এরই মধ্যে পরাজিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও তার সামরিক শক্তিধর মিত্র ইসরাইল যেভাবে সমন্বিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তার যথোপযুক্ত জবাব দিয়ে যাচ্ছে ইরান। তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর ইরানের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে যাবে, বিদ্রোহ উস্কে উঠবে এমনটাই মনে করেছিলেন ট্রাম্প ও তার মিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অবশ্য ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উস্কে দেয়ার জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপও করেন ট্রাম্প। তিনি ইরানিদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন- আমরা যেখানে শেষ করবো, আপনাদেরকে সেখান থেকে শুরু করতে হবে। আপনাদেরকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। কিন্তু তার সেই উস্কানির ফাঁদে ইরানিরা পা দিয়েছেন বলে মনে হয় না।

পাশাপাশি ইরানের ভেতরে এবং পার্শ্ববর্তী ইরাকে সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানরত কুর্দি বিদ্রোহীদেরও তিনি উস্কানি দিয়েছেন বলে নিউ ইয়র্ক টাইমস সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উস্কে দিতে এসব কুর্দিদের হাতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অস্ত্র সরবরাহ দিয়েছে বলে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদের স্বার্থে, দেশের অখণ্ডতার স্বার্থে, সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ইরানিরা সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন বলে মনে হয় না। ঐক্যবদ্ধ ইরানিরা দেখিয়েছেন ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব সবার। ফলে ঐক্যবদ্ধ ইরান হয়ে উঠেছে বার্লিন প্রাচীর বা চীনের গ্রেট ওয়ালের মতো দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে। এই ঐক্যকে পুঁজি করে ইরান যখন তার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন পশ্চিমারা দৃশ্যত দিশাহারা। বিশ্ব জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। শুধু জ্বালানি বাজারই নয়, শেয়ারবাজার টালমাটাল। কখন উত্থান আর কখন পতন ঘটবে কেউ পূর্বাভাস দিতে পারছে না।

মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলাকে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার সহ অনেক দেশ তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা বলে অভিহিত করেছে। এর পাল্টা জবাব হলো ইরানে পাল্টা হামলা চালানো। কিন্তু তারা সেই সাহসটুকুও পাচ্ছে না। যদি সেটা করে তাহলে মধ্যপ্রাচ্য একটি আগুনের পিণ্ডে রূপ নেবে। তাতে জড়িয়ে পড়বে বিশ্বের শক্তিধর আরও অনেক দেশ। যার পরিণতি হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখলের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেক্ষেত্রেও তারা এ পর্যন্ত সফল নয়। এমনকি হরমুজ প্রণালিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার জন্য ট্রাম্প যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাতে ইউরোপ, ন্যাটো, মিত্রদেশগুলো সায় দেয়নি। তারা তার ডাকে সায় দেয়নি। এ জন্যই ট্রাম্প বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ভিরু বলে অভিহিত করেন। এর পেছনে ট্রাম্পের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

কারণ, তিনি এত শক্তির অধিকারী হলেও একটিমাত্র দেশ ইরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে সক্ষম হননি। এ জন্য তাকে অন্যদের সহায়তা চাইতে বাধ্য হতে হয়। এখানেই তার পরাজয় হয়েছে বলে মনে করা যায়। আর সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে তিনি যখন অগ্রসর হয়েছেন, প্রস্তাব পাঠিয়েছেন তখন তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে ‘আপনার পরাজয়কে চুক্তি (এগ্রিমেন্ট) বলে অভিহিত করবেন না’। অর্থাৎ ইরান কোনো রাখঢাক না রেখে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে- এই যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এমন চুক্তির আশ্রয় খুঁজছেন। অবশ্য তিনি নিজে এই যুদ্ধে জয় দাবি করেছেন। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় তার সেই দাবি টেকে না। এমন অবস্থায় দুই পক্ষের মধ্যে চলছে সামরিক হামলা ও প্রতি হামলা। ইরানের ওপর অব্যাহত আছে মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলা। ইরান মধ্য ও উত্তর ইসরাইল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। আশপাশের অনেক দেশেও হামলা চালাচ্ছে ইরান। কুয়েতে একটি বিমানবন্দর ড্রোন হামলায় জ্বলছে। অগ্নিনির্বাপক বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছে। সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে হামলা চালাচ্ছে।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তারা দক্ষিণ লেবাননে ‘বাফার জোন’ সম্প্রসারণ করছে। জাতিসংঘ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর গুরুতর প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছে। এমন সময় জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোরিস পিস্তোরিয়াস বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ‘বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বিপর্যয়’। তিনি জানিয়েছেন, জার্মানি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পিস্তোরিয়াস বলেন, পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়। মাত্র দুই সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। কেউ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেনি। এটি আমাদের যুদ্ধ নয়, তাই আমরা এতে জড়াতে চাই না। পিস্তোরিয়াস যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে হামলা বন্ধ করতে এবং হত্যা থামাতে আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, যদি যুদ্ধবিরতি হয়, জার্মানি হরমুজ প্রণালির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কার্যক্রম আলোচনা করবে। তিনি বলেন, কিন্তু সময় এখনো আসে নি, তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধবিরতির আবেদন করছি।

ওদিকে ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স গোষ্ঠী জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা একদিনে দেশ ও ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ২৩টি হামলা চালিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাগুলোতে তারা ডজনখানেক ড্রোন ব্যবহার করেছে।