Image description

বৃহস্পতিবার। ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে ৯টা। হঠাৎ নদীর পাদদেশ থেকে উদ্ধার করা হয় উজ্জ্বল খান নামে ৩৫ বছরের এক ফল ব্যবসায়ীর মরদেহ। নৌবাহিনীর কোস্ট গার্ড ডুবুরি দলের সদস্যরা যখন নদীর পাদদেশ থেকে লাশটি উদ্ধার করে ফেরিঘাটের পন্টুনে উঠায় তখন উৎসুক জনতার সঙ্গে কয়েকজন লাশের স্বজনেরাও দৌড়ে আসেন। এ সময় উজ্জ্বলের হতভাগা পিতা মজনু মিয়া ঠিকই শনাক্ত করতে পেরেছেন এই মরদেহটিই তার আদরের ছেলের। সন্তানের নিথর দেহ দেখার পর চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন অসহায় এই বাবা। বৃদ্ধ বাবার এমন আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পদ্মাপাড়ের পরিবেশ। উৎসুক অনেকেই এমন দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

সরজমিন দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটে দেখা যায়, নিহত উজ্জ্বলের পিতা মজনু মিয়ার আহাজারি। স্বজনরা রাত থেকেই ঘাটে অবস্থান করছিলেন নিখোঁজ উজ্জ্বলের খোঁজে। নিহত উজ্জ্বলের পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঈদের ছুটিতে আমার ছেলে বাড়ি আসে। আমাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ কাটিয়ে বুধবার বিকালে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখনো জানতাম না ছেলে ওই বাসের ভেতরেই ছিল। রাতে তার ফোন বন্ধ পাওয়ায় সন্দেহ হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা ঘাটে চলে আসি। রাতভর ছেলের খোঁজে ঘাটেই কাটিয়ে দেই। সকালে আমার ছেলের লাশ পানি থেকে উদ্ধার করে ডুবুরি দল। কথা বলতেই হাউমাউ করে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন হতভাগা এই পিতা। বৃদ্ধ পিতা মজনু বিলাপ করে বলতে থাকেন, আমার আগেই তোর তো চলে যাবার কথা ছিল না। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো। বাড়ি গিয়ে তোর মাকে কী জবাব দিমু। আল্লাহ এমন পরীক্ষা তুমি আমারে কেমনে করলা। তার আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। নিহত উজ্জ্বল হোসেনের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার ঝাও গ্রামে।

ব্যবসায়ী উজ্জ্বলের লাশ উদ্ধারের ১ ঘণ্টা পর একই উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের ২৪ বছরের আশরাফুল ইসলামের নিথর দেহ পদ্মার পাদদেশ থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ডুবুরি দলের সদস্যরা। ছেলের সন্ধানে হতভাগা পিতা আফছার শেখ ও বড় ছেলে কামরুল ইসলামসহ পরিবারের ৫-৬ জন সদস্য নিয়ে বুধবার সন্ধ্যা থেকে ঘাটে অপেক্ষা করছিলেন। রাতে একের পর এক ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়। কিন্তু রাত গড়িয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ছেলের খোঁজে পাগলের মতো দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াতে থাকেন পদ্মাপাড়ে। যাকে পাচ্ছিলেন তাকেই জিজ্ঞেস করছেন, আমার ছেলের লাশ কী পাওয়া গেছে? কারও মুখ থেকেই কোনো উত্তর নেই।

আফছার শেখ মানবজমিন প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলছিলেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে। বলছিলেন, ২৪ বছরের আশরাফুল ঢাকার একটি কোম্পানিতে কাজ করতেন। দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার জন্য সরকারি প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের ছুটিতে এসেছিলেন বাড়িতে। ছুটি শেষে বুধবার বিকালে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দৌলতদিয়া ঘাটে বাসটি নদীতে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়ার পর থেকেই আশরাফুল নিখোঁজ। পদ্মাপাড়ে মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তে আরেকটি লাশ উদ্ধার হয়েছে বলে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। বাবা আফছার শেখ তার বুকের ভেতরে জমানো কথাগুলো শেষ করতে না করতেই দৌড়ে চলে যায় দৌলতদিয়া তিন নম্বর ফেরিঘাটে। উৎসুক জনতাকে পাশ কাটিয়ে দেখতে পায় একটি নিথর দেহ শুইয়ে রাখা হয়েছে। তখন চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন এই তো আমার আশরাফুল। এ সময় বাবা ও বড় ছেলের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পদ্মাপাড়ের পরিবেশ। এক পর্যায়ে লাশ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন হতভাগা পিতা।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাওয়া গেল পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর হোসেনের মরদেহ। কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের ৫০ বছরের পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর হোসেন তার দুই ছেলেকে বাড়িতে রেখে সহধর্মিণী মুক্তা খানম (৪৫)কে উন্নত চিকিৎসা করানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু জীবন বাঁচাতে কোনো চেষ্টাই কাজে লাগেনি এই দম্পতির। দুর্ঘটনায় বিকালে সহধর্মিণী বাসের ভেতরে আটকা পড়ে মারা যায়। রাতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হলেও স্বামী জাহাঙ্গীর হোসেন থেকে যায় পদ্মার পাদদেশেই।

রাত পেরিয়ে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ডুবুরি দলের সদস্যরা জাহাঙ্গীর হোসেনের মৃতদেহটি উদ্ধারের পর সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নিহতের বাল্যবন্ধু পল্লী চিকিৎসক নাসির উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। সহধর্মিণীর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আর যাওয়া হলো না। তার আগেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এই দম্পতি চিরবিদায় নিয়েছে। শুধু উজ্জ্বল, কামরুল, মুক্তা, জাহাঙ্গীর হোসেনই নয়। তাদের মতো ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একেকটি পরিবারের একাধিক সদস্য নির্মম মৃত্যুবরণ করেছেন। রাজবাড়ী জেলার আশপাশের উপজেলার লোকজনই হতাহত তালিকায় বেশি। এদের মধ্যে ৮ জন শিশু, ১১ জন নারী এবং ৭ জন পুরুষ।

উদ্ধার তৎপরতা: বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত উদ্ধার তৎপরতা চলছিল বেশ জোরেশোরে। মোট ২৬ মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর কোস্ট গার্ডের ডুবুরি দল। দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় হতাহতদের কোনো দাবিদার না পাওয়ায় কার্যত উদ্ধার তৎপরতা ঢিমেতালে চলতে থাকে। তবে ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক বেলাল উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বজনেরা সেই মরদেহগুলো বুঝে নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে দাবিদাররা ঘাটে আসলে তাদের সঙ্গে কথা বলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হবে বলে জানান।

বিতর্কে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা: বুধবার বিকাল ৫টার দিকে যাত্রীবাহী বাসটি পানিতে নিমজ্জিত হলে উদ্ধারকারী জাহাজ সন্ধ্যা ছয়টার দিকে দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটে পৌঁছায়। তবে বাসটি উদ্ধার তৎপরতায় উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা বিলম্বিত করায় স্থানীয় মানুষজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা বাসটি উদ্ধার তৎপরতায় কোনো ভূমিকা রাখেনি। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ১২টার পরে পানিতে নিমজ্জিত বাসটি উদ্ধার করা হয়।

পন্টুনে রেলিং ছিল না: স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্যেকটা ফেরির চারদিকে শক্তপোক্ত রেলিং রয়েছে। এতে ফেরি থেকে গাড়ি পড়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে ফেরিতে ওঠানামার পন্টুনটিতে রেলিং না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন লোড-আনলোড হয়ে থাকে। এ কারণে মাঝেমধ্যেই পন্টুন থেকে যানবাহন নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। ঠিক তেমনিভাবেই দৌলতদিয়ার ৩ নং ফেরিঘাটের পন্টুনে রেলিং না থাকায় যাত্রীবাহী বাসটি নদীতে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যাত্রী এবং স্থানীয়রা প্রত্যেকটা পন্টুনে দুর্ঘটনা রোধে রেলিংয়ের দাবি জানান। শুধু তাই নয়, ফেরিতে ওঠানামার ডাইভারশনের রাস্তাগুলো খানাখন্দকে ভরা।

তদন্ত কমিটি গঠন: এ ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার রাতে এ সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে রাজবাড়ী জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), মো. সামসুল হক, বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়ার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিন এবং রাজবাড়ীর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানাকে। এ ছাড়া সদস্যসচিব হিসেবে থাকবেন গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর এলাকার রেহেনা আক্তার (৬১), জহুরা অন্তি (২৭), কাজী সাইফ (৩০), তাজবিদ (৭), লিমা আক্তার (২৬), জ্যোৎস্না (৩৫), সোহা আক্তার (১১), সাবিত হাসান (৮), আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), গোয়ালন্দ উপজেলার মর্জিনা আক্তার (৩২), সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), বালিয়াকান্দি উপজেলার আরমান খান (৩১), কালুখালী উপজেলার ফাইজ শাহানূর (১১), জেসমিন (৩০), আব্দুর রহমান (৬), জাহাঙ্গীর হোসেন (৫০), ঝাও গ্রামের উজ্জ্বল খান (৩৫) ও মদাপুর ইউনিয়নের আশরাফুল ইসলাম (২৪), কুষ্টিয়া পৌরসভার মর্জিনা খাতুন (৫৬), সদরের খাগড়বাড়ীয়া এলাকার রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসা উপজেলার দেলোয়ার হোসেনের শিশুপুত্র ইস্রাফিল (৩), আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ৭ মাসের শিশু আরমান, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার নাছিমা (৪০), ঢাকার আশুলিয়া উপজেলার আয়েশা আক্তার সুমা (৩০)।

উদ্ধার হলো ২৬টি মরদেহ, বাকিরা কোথায়?
বুধবার বিকালে পন্টুন ভেদ করে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা সোহার্দ্য পরিবহনের বাসটি অর্ধশত যাত্রী নিয়ে দৌলতদিয়ার ৩ নং ফেরিঘাটে নদীতে পড়ে যায়। ঘটনার পর থেকে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৭ জন পুরুষসহ মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয় উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত ডুবুরি দলের সদস্যরা। তবে সূত্রমতে বাসটি পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় ৭-৮ জন জীবিত উদ্ধার হয়। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কর্তৃপক্ষের কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছে না বাসটিতে কতোজন যাত্রী ছিল। কেউ বলছে ৫০ জনের উপরে। আবার কেউ বলছেন ৫০ জনের নিচে। এমনটি হলে বাকি যাত্রীরা কোথায় গেল?