Image description

এবারের ঈদের যাত্রাপথ যেন মৃত্যু উপত্যকা। সড়ক, রেল আর নৌ-পথে প্রতিদিনই ঘটছে মৃত্যুর মিছিল। কেউ ঈদ উদ্‌যাপনে বাড়ি যেতে, আবার কেউ কর্মস্থলে ফিরতে প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে বিষাদে। ঈদের আগে ও পরে সড়ক, রেল ও নৌপথে বড় কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এবারের ঈদ যাত্রায় বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৩৪২টি দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এরমধ্যে আহত রয়েছে হাজারের বেশি। তাছাড়া বেসরকারি এই সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সালে ৪৪৩ জন; ২০২৩ সালে ৩২৮ জন; ২০২৪ সালে ৪৩৭ জন এবং ২০২৫ সালের ঈদযাত্রায় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, গত চার বছরে আটটি ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৬৭ জন। আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৯৬ জন।

২ রেল দুর্ঘটনায় ১২ নিহত

ঈদযাত্রায় দু’টি রেল দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে যাত্রীরা। ঈদের একদিন আগে বুধবার বগুড়ার সান্তাহারে ও শনিবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ট্রেনের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুই ঘটনায় ১২ জন নিহতসহ আহত হয়েছেন ৮১ জন। 

গত শনিবার ঈদের দিন দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের লেভেল ক্রসিংয়ে ঢাকাগামী চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনের সঙ্গে ‘মামুন স্পেশাল’ নামের একটি বাসের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ১২ জন যাত্রী নিহত হন। এ ছাড়াও অন্তত ১৫ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের দাবি, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রেন আসার সময় লেভেল ক্রসিংয়ের গেট নির্ধারিত সময়ে বন্ধ করতে পারেননি দায়িত্বরত গেটম্যানরা। এতেই ঘটে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় পদুয়ার বাজার এলাকায় দায়িত্বে থাকা রেলের দুই গেটম্যান হেলাল ও মেহেদীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। প্রধান আসামি হেলাল উদ্দিনকে মঙ্গলবার রাতে বুড়িচং উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী শঙ্কুচাইল থেকে গ্রেপ্তার করে র?্যাব ।

অন্যদিকে, ১৮ই মার্চ দুপুরে বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে অন্তত ৬৫ জন আহত হন। এতে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ প্রায় ২১ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও দুর্ঘটনাকবলিত যাত্রীদের সঙ্গে জানান, বাগবাড়ী এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। ওই স্থানে লাল নিশানা টাঙানো ছিল। ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঈদে ঘরমুখো যাত্রীতে ভরা ছিল। ট্রেনটি সান্তাহার জংশনে যাত্রাবিরতির পর আক্কেলপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সান্তাহার জংশনের দুই কিলোমিটার উত্তরের বাগবাড়ীতে এসে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা নিচে পড়ে আহত হন। এ ছাড়া বগির ভেতরে থাকা অনেক যাত্রীও আহত হন।

সদরঘাটে ২ যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু
ঈদের আগে ১৮ই মার্চ বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টায় সদরঘাটে ঢাকা-ইলিশা রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে ট্রলার দিয়ে যাত্রী তোলার সময় পেছন থেকে ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামে আরেকটি লঞ্চ সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে দুই লঞ্চের মাঝে পিষ্ট হয়ে নিহত হন মিরাজ ফকিরের ছেলে সোহেল ফকির। আর নদীতে নিখোঁজ হন মিরাজ ফকির। একই ঘটনায় আহত সোহেলের গর্ভবতী স্ত্রী রুবা ফকির। গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নদীতে তলিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ৪৯ ঘণ্টা পর মিরাজ ফকিরের মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ-পুলিশ। এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সিরাজ ফকির বাদী হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলাও করেন। দুর্ঘটনার একটি ভিডিওচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় সেটি।

দৌলতদিয়া ঘাটে বাস ডুবিতে ২৬ জনের প্রাণহাণি

গত বুধবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যায়। এই ঘটনায় ১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়- বাসটি ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় পন্টুনে ছিল। ফেরিটি পন্টুনে যুক্ত ছিল। ফেরিতে যাত্রী ও যানবাহন ছিল। চলন্ত বাসটি মুহূর্তের মধ্যে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাসটি পড়ার মুহূর্তে পন্টুন ও ফেরিতে থাকা লোকজন সেদিকে দৌড়ে যান। বাসটি ডুবে যাওয়ার পর সেখান থেকে কয়েকজন ভেসে ওঠেন। তখন পন্টুন ও ফেরিতে থাকা লোকজন তাদের দিকে রশি ও লাইফবয় ফেলেন। তারা সেটি দিয়ে ধরে ওঠে আসেন।

ঈদযাত্রায় হঠাত দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের সড়কের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাজানোসহ দক্ষ চালক তৈরি করা প্রয়োজন। ঈদযাত্রার জন্য ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচাক সাইদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, দেশের ঈদযাত্রাসহ সব দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পুরো সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশের সঠিক পরিবহন ব্যবস্থা নেই; তাই এ সব দুর্ঘটনা কখনই প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সেজন্য দেশের পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সকল প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে নতুন করে সাজাতে হবে।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ মানবজমিনকে বলেন, সারা বছর যে সড়কে যেসব অব্যবস্থাপনা থাকে ঈদের আগে চেষ্টা করা হয় যাতে সেসব ঠিক করা যায়। কারণ মনে করা হয় ঈদের আগে মুভমেন্ট বেশি হবে। ছুটি বাড়িয়ে দিলেও আমরা ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে পারিনি। ভাবা হয়, ছুটি বাড়িয়ে দেয়া হয়তো সমাধান; আসলে ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও দেখতে হবে। এবার যানজট যেমন বেশি, দুর্ঘটনাও বেশি। যে যেভাবে পারছে গাড়ি নামিয়েছে সড়কে। কেউ ব্রেক-ফেইল করছে, কেউ ক্লান্ত হয়ে গেলেও টানা গাড়ি চালাচ্ছে।

রেলের ক্ষেত্রে মেইন্টেনেন্সের কাজগুলো ঈদের আগে করে নেয়া দরকার। এবার ঈদের সময়ও এই ধরনের কাজগুলো করতে দেখা গেছে। অনেক গাড়ি উল্টে পড়ছে; এটার মানে হচ্ছে- গাড়িগুলোর ফিটনেসে সমস্যা এবং চালকের মধ্যেও সমস্যা রয়েছে। আমরা সেভাবে এখনও চালক তৈরি করছি না। সার্বিকভাবে বলা যায়, অব্যবস্থাপনার বড় ঘাটতি রয়েছে।