Image description

দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিন দফায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ১৬৮ জন সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিজয়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন তারেক রহমানের সরকার সাংবাদিকদের বাতিল হওয়া কার্ড ফিরিয়ে দিতে তাদেরকে আপিল করার সুযোগ দেয়। সে লক্ষ্যে তথ্য ও সস্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান করে আপিল বোর্ড গঠন করা হয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বাতিল কার্ডধারী বেশিরভাগ সাংবাদিক ওই বোর্ডে আপিল করেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আপিল বোর্ড কোনও সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় উল্লিখিত ১৬৮ জন সাংবাদিকের কাজ করার বিষয়টি অনিশ্চিত। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্য অধিদফতরের প্রজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য অধিদফতর ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ২০ জন, ৩ নভেম্বর ৩০ জন এবং ৭ নভেম্বর ১১৮ জনসহ মোট ১৬৮ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তথ্য অধিদফতরের সে সময়ের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা নিজামুল কবীরের সই করা পৃথক তিনটি আদেশেই বলা হয়েছিল ‘‘প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২২ এর অনুচ্ছেন ৬.৯, ৬.১০, ৯.৫ এবং ৯.৬ এর আলোকে এসব কার্ড বাতিল করা হলো।’’

প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা সাংবাদিকদের মধ্যে সম্পাদক, উপসম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক, টেলিভিশনের বার্তাপ্রধানসহ বিভিন্ন পদে কর্মরত সাংবাদিকরা রয়েছেন। যাদের মধ্যে অনেকের নামেই পরবর্তীকালে বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও এসব মামালার চার্জশিট দেওয়া হয়নি। ‘প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২৪’ অনুযায়ী ১৬৮ জন সাংবাদিকের কার্ড বাতিল করা হলেও আপিলে নিষ্পত্তি করা হবে ‘প্রেস অ্যাক্রেডিচেশন নীতিমালা ২০২৫’ অনুসারে। নতুন নীতিমালায় বাতিল করা কার্ড পুনরায় ইস্যু করার বিষয়টি অনেকটাই সহজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে গঠিত ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটি’ যাচাই- বাছাই ছাড়া এসব কার্ড পুনরায় ইস্যু না করার পরামর্শ দিয়েছিল। সে কারণে বর্তমান সরকার ওইসব সাংবাদিকের কার্ড ফিরে পাওয়ার বিষয়টি সহজ করতে ‘আপিল বোর্ড’ গঠন করে।

এ প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, সচিবালয়ে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে এবং কার্ডের অপব্যবহার রোধে পিআইডি ইস্যুকৃত অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড ব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল ও নীতিমালার আলোকে করা হবে। মিডিয়া হাউস থেকে মনোনীত প্রতিনিধিদের কার্ড দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে এবং একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের মতামত নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে মিডিয়া হাউস-ভিত্তিক কার্ডের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা চালু করা হবে। অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করা হবে। গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ যেন চাঁদাবাজি বা অপব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা হালনাগাদ করা হবে এবং যদি কোনও সাংবাদিক অন্যায়ভাবে কার্ড থেকে বাদ পড়ে থাকেন, তবে নীতিমালা অনুযায়ী তাদের কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যেতে চাই।’’ তাই নীতিমালা অনুযায়ী অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।

প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন আপিল কমিটি

‘প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী সাংবাদিকদের সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রদানে সংক্ষুব্ধদের আপিলের জন্য গঠিত ৭ সদস্যের ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন আপিল কমিটি’র সভাপতি হলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা এবং সদস্য সচিব প্রধান তথ্য অফিসারের রুটিন দায়িত্ব পালনকারী তথ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মো. ইয়াকুব আলী। কমিটির অপর ৫ সদস্য হলেন— তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, সাংবাদিক নেতা ও মনোনীত ব্যক্তিরা। এই কমিটি ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের সেই সময়কালের সচিব মো. মকবুল হোসেনের সই করা ‘প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২২’ এর অনুচ্ছেদ ৬.৯ এ বলা হয়েছে, ‘‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী সাংবাদিকরা রাষ্ট্রীয় কোনও আইন, বিধি বা নীতিমালা লঙ্ঘন করলে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন, বিধিবিধান ও নীতিমালা অনুসারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। তবে গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রধান তথ্য অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করতে পারবেন। এক্ষেত্রে, পরবর্তীকালে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটির সভায় তা উপস্থাপন করতে হবে।”

একই নীতিমালার “৬.১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— মিথ্যা, হয়রানিমূলক, রাষ্ট্রদ্রোহী বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী কোনও সংবাদ প্রচারের অভিযোগে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা দায়ের হলে এবং এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল হলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের নামে ইস্যুকৃত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটি প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে কমিটি কার্ডটি বাতিল করতে পারবে।”

প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২২ এর ৯.৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডধারী সাংবাদিক/সংবাদকর্মী বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত ‘কোড অব কনডাক্ট’ অথবা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ‘প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা’র কোনও শর্ত লঙ্ঘন করলে তার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এবং বাতিল সংক্রান্ত আদেশ তথ্য অধিদফতর তাৎক্ষণিকভাবে জারি করবে।”

প্রেস এ্যক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২২ এর ৯.৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—  ‘‘এই নীতিমালার যেকোনও শর্ত লঙ্ঘন করলে, অথবা অন্য কোনও যৌক্তিক কারণে প্রধান তথ্য অফিসার প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল বা স্থগিত করতে পারবেন।”

জানা গেছে, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল হওয়া ১৬৮ সাংবাদিকের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকের নামে বিভিন্ন থানায় ফৌজদারি মামলা থাকলেও বেশিরভাগ সাংবাদিকের নামে কোনও ফৌজদারি বা অন্য কোনও মামলা নাই। কার্ড বাতিল সংক্রান্ত জারি করা নোটিশে ‘নীতিমালা ২০২২’ এর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের উল্লেখ থাকলেও কোন অভিযোগে কার কার্ড বাতিল করা হলো— তার সুস্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা নেই। নতুন নীতিমালায় ফৌজদারি মামলায় চূড়ান্ত চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত কার্ড বাতিল না করার বিধান রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও প্রেস আ্যাক্রেডিটেশন আপিল বোর্ডের সদস্য শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘‘আপিল বোর্ড থেকে অনুমোদন পাওয়া আবেদনগুলো সরাসরি পিআইডিতে গেলে পিআইডি নতুন কার্ড ইস্যু করবে। তবে এখনও পর্যন্ত আপিল কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।’’  

আপিল বোর্ড বা কমিটির সদস্য সচিব তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য অফিসারের রুটিন দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মো. ইয়াকুব আলী বলেন, ‘‘আমার জানা মতে, আপিল কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। কমিটির বৈঠকে যাচাই শেষে অনুমোদন পাওয়া বাতিল কার্ডগুলো শিগগিরই ইস্যু করা হবে।’’