Image description

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) না পেয়ে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছে। গত আড়াই মাসে শুধু আইসিইউর অপেক্ষায় থেকেই মারা গেছে অন্তত ৫৩ শিশু। এই সময়ে আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি আরও ৯ জনকে। সব মিলিয়ে আড়াই মাসে প্রাণ হারিয়েছে ৬২ শিশু।

 

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরা গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হলেও প্রয়োজনীয় সময়ে আইসিইউ না পাওয়ায় চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। আইসিইউতে জায়গা খালি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আর সেই অপেক্ষা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে মৃত্যুর প্রতীক্ষা।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরিকুল ইসলামের ৬ মাস বয়সী ছেলে রিদুয়ান কয়েক দিন ধরে জ্বর ও শরীরে ঘামাচির মতো দানা দেখা দেয়। অসুস্থতা বাড়লে নেওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা হামের লক্ষণ শনাক্ত করে তাকে দ্রুত রামেক হাসপাতালে রেফার করেন।

 

রামেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও মেলেনি শয্যা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ১৮ মার্চ মারা যায় শিশুটি।

 

রিদুয়ানের পরিবারের দাবি, সময়মতো আইসিইউ পেলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত।

 

একই ধরনের ঘটনা ১০ মাস বয়সী জিহাদুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। কয়েক দিন ধরে কাঁপুনি ও শরীরে কালচে দাগ দেখা দিলে তাকে প্রথমে রাজশাহীর দুর্গাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে রামেকে রেফার করা হয়।

 

চিকিৎসকেরা আইসিইউতে নেওয়ার কথা জানান। কিন্তু আইসিইউ বেড ফাঁক না থাকায় তাকে ‘সিরিয়াল’-এ থাকতে হয়। আইসিইউ না পেয়েই ১৮ মার্চ দুপুরে মারা যায় জিহাদুল।

 

রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, আইসিইউতে ১২টি শয্যা রয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে, কেউ মারা না গেলে বেড খালি হয় না। কোনো বেড ফাঁকা হলেই অপেক্ষমাণ তালিকা অনুযায়ী রোগী নেওয়া হয়।

 

চিকিৎসকরা জানান, নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউ সুবিধা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

 

রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ নেই। সাধারণ আইসিইউর ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য নির্ধারিত করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

 

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম জানান, বর্তমানে ৪০ শয্যার আইসিইউ ওয়ার্ড চালু রয়েছে। সেটিও সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। সেখানে সরকারি নিয়োগও দেওয়া হয়নি। হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমিত জনবল দিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে।

 

রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ১০ শয্যার শিশুদের আইসিইউ আছে। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি হস্তান্তরই করেনি, জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি। এই হাসপাতালটি চালু হলে ১০ শয্যার শিশুদের আইসিইউ সেবা নিশ্চিত হবে। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সুবিধা অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

 

রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এখন নীরব আতঙ্ক। অনেক অভিভাবক জানেন, আইসিইউ প্রয়োজন হলে তাদের সামনে দু’টি পথ— হয় অন্য কারোর মৃত্যুর অপেক্ষা অথবা নিজ সন্তানের অনিবার্য পরিণতি।