রাজধানীর গুলশানে ৫০ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়ির মালিক সাবেক এক সচিব। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের ১৭ বছর ধরে তিনি বাড়ির ধারে কাছেও যেতে পারেননি। র্যাব, পুলিশ থেকে শুরু করে ওই সরকারের প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি। কারণ, বাড়ি দখলের নেপথ্যে ছিলেন একজন প্রভাবশালী সাবেক সেনা কর্মকর্তা। যার নাম লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। যিনি বিগত এক-এগারোর সরকারের অন্যতম কুশীলব হিসাবে পরিচিত। সোমবার গভীর রাতে বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে তাকে মানব পাচার মামলায় ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এদিকে তাকে গ্রেফতারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নানা অপকর্ম অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছেন। এর মধ্যে উল্লিখিত বাড়ি দখল করতে গিয়ে কিভাবে মাসুদ উদ্দিন গংরা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন সে বিষয়ে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তদন্তের স্বার্থে ইতোমধ্যে বাড়িটির সিসি ক্যামেরার ডিভিআর জব্দ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ৬ তলা বাড়ির মালিক সাবেক সচিব এবং বিএনপি নেতা এএইচ মোফাজ্জল করিম। ২০০৩ সালে বাড়িটি নির্মিত হয়। পরে সেখানে কোয়ালিটি ইন নামের একটি আবাসিক হোটেল ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে জেনারেল মাসুদ চৌধুরীও হোটেলের সঙ্গে যুক্ত হন। মূলত এরপরই বাড়ি বেদখল হতে থাকে। এ সময় হোটেল ঘিরে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হোটেলে অবৈধ মদের ব্যবসা ছাড়াও নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়। এ কারণে রাত ১০টার পর থেকে শেষ রাত পর্যন্ত প্রতিদিনই সেখানে শত শত তরুণ-তরুণী ভিড় জমান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে গুলশান সোসাইটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশসহ সিটি করপোরেশনেও অভিযোগ জানানো হয়। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় উলটো গুলশান সোসাইটির তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্তদের গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে হয়রানি করা হয়।
তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই সবকিছু পালটে যায়। এ সময় দখলদার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের সবাই রাতারাতি আত্মগোপনে চলে যান। একপর্যায়ে ১১ নভেম্বর মধ্যরাতে হোটেলে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (নারকোটিক্স)। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদসহ কামাল উদ্দিন এবং আরিফুল ইসলাম নামের ডিজে পার্টির ২ আয়োজককে গ্রেফতার করা হয়। পরে এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে নারকোটিক্স।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নারকোটিক্সের মামলার পর হোটেলের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গত বছরের জানুয়ারি থেকে হোটেলটি অনেকটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এরপর মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা এসে হোটেলের সাইনবোর্ড সরিয়ে ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। ভবনের সামনে একাধিক নিরাপত্তা প্রহরীও নিয়োগ করা হয়।
বুধবার সরেজমিন বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। ভবনের সামনে ইব্রাহিম নামের পোশাকধারী এক নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ব্ল্যাক টিম নামের একটি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে তারা দুজন পালাক্রমে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে পাশের ভবনের এক নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন-সম্প্রতি র্যাব, পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এসে জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য জানতে চান। কেউ কেউ আবার ভবনের ছবিও তোলেন।
বাড়ির মালিক সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিমের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, বাড়ি দখল এবং হোটেল ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর নেপথ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী একা নন। তার সঙ্গে কর্নেল সাদেকুল ইসলাম নামের আরেক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। তিনি মাসুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে পরিচিত। গুলশান এলাকায় সবাই তাকে কর্নেল সাদেক নামে চেনেন। তিনি কোয়ালিটি ইন হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন। তবে ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কর্নেল (অব.) সাদেককেও আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র বলছে, এক-এগারোর সরকারের আমলে সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ব্যাপক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। সে সময় তাকে গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সমন্বয়ক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে-এ সময় মাসুদ চৌধুরীর পরিকল্পনায় দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের পরোয়ানা ছাড়াই ধরে আনা হয়। এদের অনেকের কাছ থেকে চাপের মুখে জবানবন্দি আদায় ছাড়াও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের অনেককে তিনি উপস্থিত থেকে টর্চার করেন। দেশি-বিদেশি চক্রের সহযোগী হিসাবে দেশবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ২০০৮ সালে নির্বাচন দেওয়ার আগে জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পরিকল্পনা অনুযায়ী সেফ এক্সিট রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়। এর ফলে নির্বাচনের পর তিনিসহ সংশ্লিষ্টদের নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্নেল সাদেক ছাড়াও মাসুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অন্যতম ছিলেন মশিউর রহমান মামুন নামের এক ব্যবসায়ী। পরে অবশ্য অভ্যন্তরীণ মতভিন্নতার জের ধরে ২০১৪ সালে মামুন নিজেও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে গুমের শিকার হন। ঘটনার পর মামুনের স্ত্রী থানায় জিডি করেন এবং তৎকালীন একজন র্যাব কর্মকর্তার সহায়তায় শেষ পর্যন্ত স্বামীকে ফিরে পেতে সক্ষম হন। গুম অবস্থা থেকে মুক্তির পর মামুন স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।
বাড়ি দখল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক সচিব এএইচ মোফাজ্জল করিম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, তার বাড়ি যেভাবে দখল করা হয়েছে তা নজিরবিহীন। এর নেপথ্যে ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং কর্নেল (অব.) সাদেকুল ইসলাম। তারা ভাড়া না দিয়েই পুরো বাড়িটি দখল করে রাখেন। এখন পর্যন্ত তাদের কাছে প্রায় ৭ কোটি টাকারও বেশি ভাড়া পাওনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এসব নিয়ে অনেকের কাছে দেনদরবার করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও থেকে ন্যূনতম আইনগত সহায়তাও পাওয়া যায়নি। বরং উলটো তাকেই হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় নেই। শেষমেশ তারা দখল ছেড়ে দিয়ে সরে যাওয়ার পর আমরা দখল বুঝে পেয়েছি।