Image description
অর্ধশত যাত্রী নিয়ে বাস ডুবি

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে গেছে। বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। বাসটিতে অর্ধশত যাত্রী ছিল বলে জানিয়েছেন বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা। ডুবে যাওয়ার সময় বাস থেকে ৬-৭ জন যাত্রী ভেসে উঠলে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ছাড়া পন্টুনে ওঠার আগে ৪-৫ জন যাত্রী নেমে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান। এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের কাছে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। রাত ১০টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। নিখোঁজদের লাশের সন্ধান দাবিতে স্বজনরা ঘাটে আহাজারি করছেন।

মারা যাওয়া দুই নারী হলেন- রেহেনা বেগম (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। রেহেনার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। মর্জিনা বেগমের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাধীন আছেন নুসরাত (২৯) নামের এক নারী। তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

দৌলতদিয়া ঘাট সূত্র জানায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ৩নং ফেরি ঘাটের পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি যেখানে পড়েছে সেখানে অত্যন্ত গভীর পানি রয়েছে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের কাছে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। একটি সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ২টা ১০ মিনিটে কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা বাসটিতে ৬ জন যাত্রী ছিল। এরপর খোকসা থেকে ৭ জন, মাছপাড়ায় ৪ জন, পাংশায় ১৫ জন ওঠেন। ইঞ্জিন কাভারেও ৪ জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া গোয়ালন্দ ঘাটে কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীসহ বাসে অন্তত ৫০ জন ছিলেন। যাদের বেশির ভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। রাজীব নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত দুজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। মারাত্মক আহতাবস্থায় সাতজনকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। বাকিরা এখনও নিখোঁজ।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন- বিকাল পাঁচটার কিছু পর যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অপর ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তিনি আরও জানান- বাসে নারী-শিশুসহ অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিল। তবে কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছেন। দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা সাকিব হোসেন, আব্দুল আজিজ, দেলোয়ার হোসেন ও শিশু আলিফ জানান, বাসটিতে নারী-শিশুসহ অনেক যাত্রী ছিলেন। পন্টুনে ওঠার আগে ৪-৫ জন যাত্রী নেমে গেলেও বাসটি নদীতে পড়ে গেলে স্থানীয়রা ৬-৭ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। বাকিরা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে- বাসটি ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় পন্টুনে ছিল। ফেরিটি পন্টুনে যুক্ত ছিল। ফেরিতে যাত্রী ও যানবাহন ছিল। চলন্ত বাসটি মুহূর্তের মধ্যে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাসটি পড়ার মুহূর্তে পন্টুন ও ফেরিতে থাকা লোকজন সেদিকে দৌড়ে যান। বাসটি ডুবে যাওয়ার পর সেখান থেকে কয়েকজন ভেসে ওঠেন। তখন পন্টুন ও ফেরিতে থাকা লোকজন তাদের দিকে রশি ও লাইফবয় ফেলেন। তারা সেটি দিয়ে ধরে ওঠে আসেন।

রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা আক্তার বলেন, সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস কুষ্টিয়া থেকে রওনা হয়েছিল। কুষ্টিয়ার যাত্রী ছিল ২০ থেকে ২৫ জনের মতো। রাজবাড়ীর পাংশায় কিছু যাত্রী উঠেন। পরে আরও কিছু যাত্রী উঠেছেন। তিনি আরও বলেন, ফেরিতে ওঠার সময় মাত্র ৩ জন যাত্রী বাইরে ছিলেন। বাকিরা গাড়িতেই ছিলেন। গাড়িটির গতি অনেক বেশি ছিল। সে কারণে ফেরিতে ওঠার সময় সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেছে। স্থানীয়দের বরাতে ডিসি সুলতানা আক্তার আরও জানান, ৭ জনের মতো যাত্রী নদী থেকে উঠতে পেরেছেন। বাকিরা বাসে থাকার কথা। সেখানে ৩০ থেকে ৩৫ বা ৪০ জনের মতো যাত্রী হতে পারে। ৬ জন ডুবুরি নদীতে নেমেছে। নদীতে পড়ে যাওয়া বাসের যাত্রীদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা এসেছে। ঢাকা থেকে আরও ডুবুরি আসছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোর্শেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন বলেও তিনি জানান। ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ইন্সপেক্টর মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আনুমানিক ৩০ ফুট গভীরে বাসটি ডুবে গেছে এবং ডুবে যাওয়ার পর ৫-৭ জন নাকি বাস থেকে বের হতে পেরেছেন। তিনি জানান, বাসটি পদ্মায় ডুবে যাওয়ার খবর ফায়ার সার্ভিসের কাছে আসে ৫টা ২০ মিনিটে। এর ছয় মিনিটের মাথায় গোয়ালন্দ থেকে একটি ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর আরিচা থেকে একটি দল সেখানে যোগ দেয়। সেই হিসেবে দুই ইউনিট মিলে আনুমানিক ১৫-২০ জনের একটি দল উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নদীতে পড়ে যাওয়া বাসের যাত্রীদের উদ্ধারে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা শুরু করেছে। এছাড়াও ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিসি, নৌপুলিশ, সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর সংস্থা ও স্থানীয় ডুবুরি দল উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।