Image description
প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কটে বাড়তি খরচ হচ্ছে ২৭ হাজার কোটি টাকা :: প্রতিদিনই অবস্থার অবনতি

রাজধানীর যানজটের ভোগান্তি নিত্যদিনের। ঈদ উপলক্ষে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ায় ঈদের পর থেকে ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্ট ছাড়া কোথাও কোনো যানজট দেখা যায়নি। এর কারণ হিসেবে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা অথবা ইজিবাইকের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। বাস-চালকরা জানান, ঈদের পর থেকে বেশির ভাগ ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটো-চালকরা বাড়িতে গেছেন। সে কারণে ঢাকা শহর গত কয়েক দিন ধরে অনেকটাই ফাঁকা। ভোগান্তি নেই বললেই চলে। আমরাও চলাচল করতে পারছি অবাধে।

ঢাকা মহানগরীতে যানজটে প্রতিদিন ৩৮ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে বলে ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। এক বছর পর বুয়েটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই অঙ্কটি বেড়ে এখন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টার মতো হয়েছে। যা সরাসরি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সঙ্কট। ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে তেলের দাম। অতিরিক্ত দামে তেল কিনতে বাড়তি জ্বালানি খরচের পেছনে ব্যয় হচ্ছে কমপক্ষে ২৭ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যানজটের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি জ্বালানির অপচয়, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ এবং ব্যবসায়িক বিলম্ব মিলিয়ে বছরে চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। এমনকি বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান বিশ্বের পরিবেশদূষণে প্রায়ই শীর্ষ অবস্থানে থাকছে। এতে করে মানুষের মধ্যে রোগ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীতে যানজটে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ জাতীয় বাজেটের ১১ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎÑ যানজটে প্রভাব সরাসরি গিয়ে প্রভাব ফেলছে জাতীয় অর্থনীতিতে। এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলছেন, নগরের যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমানো যায় তবে বছরে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে। তিনি বলেন, ঢাকায় যানজটের কারণে পিক আওয়ারে গণপরিবহনগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতিও পাঁচ কিলোমিটার। এতে করে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ঢাকা শহরে গণপরিবহনগুলো প্রতিদিন ৩৬ লাখ ট্রিপে ৩৫ শতাংশ যাত্রীকে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যায় বলে বুয়েটের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

যানজটের প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে প্রফেসর মোয়াজ্জেম বলেন, যানজটের কারণে মানবদেহের ৯টি দিক নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগে প্রভাব পড়ছে। গণপরিবহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের নানাভাবে নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে ওই প্রতিবেদনে। নগরের যানবাহন পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনতে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দেন প্রফেসর মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এখন ঢাকায় ১৫০ থেকে ২০০ বাস সার্ভিস চলছে। এটিকে প্রতিটি রুটে একটি করে কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলে ভালো হয়। এতে করে সড়কে প্রতিযোগিতা কমবে। আন্তঃজেলা বাস-টার্মিনালগুলো সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শও দেন তিনি। তিনি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিটিসিএ, সিসিএস, রাজউক, আরএইডি, এলজিইডি, বিআরটিএর মধ্যে একটি সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। পরিবহন খাতে ভর্তুকি দেয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রফেসর মোয়াজ্জেম বলেন, বছরে এক হাজার কোটি টাকা সাবসিডিয়ারি দিয়ে বছরে যদি পাঁচ হাজার কোটি টাকা লাভ করতে পারি, তবে সেখানে সাবসিডিয়ারি দিলে ক্ষতি কোথায়?

এদিকে, ঢাকা শহরের মোট দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশ পথচারী পারাপারের সময় ঘটে বলে বুয়েটের আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স দিতে আরো বেশি সতর্ক হওয়া, নগরে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা, বাইসাইকেল লেইন ও হাঁটার পথ তৈরি করার পরামর্শ দেয়া হয়। একই সাথে ঢাকায় লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরামর্শও দেয়া হয়।

অন্যদিকে, বর্তমানে যানজটের প্রধান কারণ রাজধানীর রাস্তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। রাজধানীতে মোট চলাচলরত গাড়ির নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বিআরটিএর কাছে নেই। কারণ প্রতিদিন নতুন যানবাহন যুক্ত হচ্ছে এবং অনেক অনিবন্ধিত যানও রাস্তায় চলাচল করছে অবাধে। তবে বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়। যেমনÑ বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ৬৫ লাখ চার হাজার। এর মধ্যে ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ২৩.২ লাখ, এর বাইরে বিপুল সংখ্যক অনিবন্ধিত যান (রিকশা, অটোরিকশা, ইজিবাইক) চলাচল করে, যা সরকারি হিসাবের বাইরে। বাংলাদেশ অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, হাসিনার পতনের আগে ঢাকায় অনিবন্ধিত ব্যাটারি রিকশা বা ইজিবাইকের সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ১২ লাখ। হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বন্যার পানির মতো হুহু করে ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক ঢাকায় প্রবেশ করে। বর্তমানে এর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি। ইউনূস সরকার শুরুর দিকে এসব রেজিস্ট্রেশনবিহীন যান ঢাকা থেকে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ততদিনে এসব যানের চালকরা নিজেদের মধ্যে জোট বেঁধে ফেলেছে। তারা সরকারের এই উদ্যোগের প্রতিবাদ করে বনানী এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে। এমনকি তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপরও চড়াও হতে দ্বিধা করে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে বাস-মালিক সমিতির নেতারা বলেন, সরকারের উচিত ছিল প্রথম থেকেই সচেতন হওয়া। অটোরিকশা-চালকরা এখন একতাবদ্ধ। তারা এক ডাকে ঢাকা শহরকে অচল করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক সভাপতি আবদুল হামিদ শরীফ বলেন, একটি মোটামুটি উন্নত শহরের জন্য ২৫ শতাংশ ভালো সড়ক প্রয়োজন। বাংলাদেশে রয়েছে ৭.৮ শতাংশ। যানজটের অন্যতম কারণ এসব রাস্তা ও রাস্তার পাশেই গাড়ি পার্কিং করা। যানজট নিয়ন্ত্রণের উপায় কীÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক কাঠা জমিতে এলিভেটেড টাওয়ার পার্কিং নির্মাণ করতে পারলে সেখানে ৫০টি গাড়ি পার্কিং করা যায়।

ঢাকা শহরে পর্যায়ক্রমে ১০০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এগুলোর প্রতিটি নির্মাণে চার কোটি টাকা ব্যয় হবে। সরকার যদি উদ্যোগ নেয় তবে দাতা সংস্থা জাইকা এতে তহবিল জোগাতে ইচ্ছুক। সরকার ইচ্ছা করলেই এমন উদ্যোগ নিতে পারে।