Image description
স্বাধীনতার ৫৫ বছর । আসেনি অর্থনৈতিক মুক্তি, নিশ্চিত হয়নি ব্যক্তিস্বাধীনতা, দেখা নেই সুশাসনের ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো আর শূন্য ভান্ডার নিয়ে যাত্রা করা বাংলাদেশ এখন আর সে অবস্থায় নেই। নানা চড়াই-উতরাইয়ে অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাফল্যজনকভাবে এগিয়েছে। কিন্তু পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও আসেনি অর্থনৈতিক মুক্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তলানিতে। সেই সঙ্গে ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা নিশ্চিত হয়নি। সত্যিকার সুশাসনের ছিটেফোঁটাও আসেনি দেশে। একের পর এক রাজনৈতিক দল দেশ শাসন করলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেউই। বরং শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের কারণে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসেও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা। ফলে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা বিশ্বের গুটিকয় দেশের অন্যতম বাংলাদেশের জন্য এখনো অধরা প্রকৃত স্বাধীনতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি সামগ্রিক সুশাসনের অভাবে। ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক শৃঙ্খলা না আসায়। ফলে উন্নয়নের সুফল পৌঁছায় না সবার কাছে। এ কারণে যে বৈষম্য দূর করতে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করা হয়। সেই ধনী-গরিব ও উঁচুনিচুর বৈষম্য এখনো বাড়ছে হুহু করে।

অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা আছে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। তখন মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্য থেকে মুক্তি ঘটবে। সমৃদ্ধ, সুখী ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পথচলা মসৃণ হবে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বেড়েই চলেছে। গত কয়েক দশকে অনেকেই আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে। আসেনি মানুষের বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার নিশ্চয়তা। আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা নেই। ব্যাংক-বিমা থেকে অনেক আমলেই হয়েছে হরিলুট।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো এর বিচার করতে পারছে না। কারণ সেগুলোতেও নেই কোনো শৃঙ্খলা। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশন কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিক ক্রমতালিকা প্রকাশ করছে। সর্বশেষ গত মাসে প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১২০তম। গবেষণা সংস্থাটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচক তৈরিতে- আইনের শাসন, সরকারি আয়-ব্যয়ের পরিমাণ, নিয়ন্ত্রণগত দক্ষতা এবং মুক্তবাজার এ চারটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেকটিকে আবার তিনটি সূচকে মূল্যায়ন করে মোট ১২টি মাপকাঠির মাধ্যমে একটি দেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ১২টি মাপকাঠির মধ্যে আইনের শাসনের অধীনে রয়েছে সম্পদের অধিকার, বিচারিক কার্যকারিতা ও সরকারের শুদ্ধতা। সরকারি আয়-ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে করের বোঝা, সরকারি ব্যয় ও রাজস্ব অবস্থা। নিয়ন্ত্রণগত দক্ষতার মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়িক স্বাধীনতা, শ্রমিক অধিকার ও মুদ্রানীতির স্বাধীনতা। মুক্ত বাজারের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক সুযোগ, বিনিয়োগ সুযোগ ও আর্থিক সুযোগ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই উন্নয়নের সুফল সবাই সমানভাবে পায়নি এটাও সত্য। অর্থাৎ আমরা একদিকে উন্নয়নের ধারায় এগিয়েছি, অন্যদিকে বৈষম্যের বাস্তবতার মধ্যেও আছি। আমরা আশা করি, বৈষম্যবিরোধী যে চেতনা সমাজে তৈরি হয়েছে, সেটিকে সামনে রেখে একটি নতুন সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা থাকবে। এ উন্নয়নের ধারা আরও বেগবান রাখতে হবে এবং তা যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়- যাতে সমাজের সব মানুষ উন্নয়নের সুফলে সমানভাবে অংশীদার হতে পারে। আজকের দিনে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো অর্জিত হয়নি। দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও এখনো প্রায় চার কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- দেশে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। আয়, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। উন্নয়নের বর্তমান ধারা এই বৈষম্য কমাচ্ছে না, বরং বাড়াচ্ছে। ধনী ও ক্ষমতাবানরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে, আর দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বড় একটি জনগোষ্ঠী বেকার থেকে যাচ্ছে। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তাই এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা । যেখানে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত করা হবে। এভাবেই আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক এবং প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসেও আমরা কার্যকর নির্বাচনি ব্যবস্থা যেটা ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেবে তার ব্যবস্থা করতে পারি নাই। আরও অনেকগুলো মানবাধিকার যেমন ন্যায়বিচারের অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং আরও অনেক মৌলিক অধিকার থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। আবার অনেকে অধিকার বেশি পরিমাণে উপভোগ করেছে। অর্থনৈতিক অধিকার থেকেও সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হয়েছে। এই জটিল সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত রাজনীতিবিদদের তাদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। কারণ এই দেশ সৃষ্টি হয়েছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানুষ রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছেন। যারা সরকার পরিচালনা করে, তাদেরকেই মানুষের জন্য এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। এত বছর পরও এখনো মানুষ দেশপ্রেমিক হয়ে উঠতে পাড়েনি। ভোটাধিকার, মতামত প্রকাশ, মানবাধিকার লুণ্ঠিত হওয়া থেকে উত্তরণের জন্য সবারই দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকা উচিত। দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটা রাজনৈতিক দল হোক বা অন্য পর্যায়ের কেউ সবারই করা উচিত। সবাইকেই দেশপ্রেমিক হয়ে উঠতে হবে। তাহলেই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হবে।