Image description
বিভিন্ন স্থান থেকে তেল কিনছে সরকার

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সহজে কাটছে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের উত্তাপও কমছে না। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মজুতের ক্ষমতা ৩৮ দিন থেকে ৬০ দিনে উত্তীর্ণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এদিকে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে রাশিয়া থেকে ২ মাসের জন্য তেল ক্রয়ের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে মার্কিন সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি বিভাগ। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার যে কোনোভাবে তেলের মজুত বাড়াবে। এজন্য সরাসরি ক্রয় নীতির (ডিপিএম) আওতায় আরও চার কোম্পানির কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। আজ-কালের মধ্যে ওই প্রস্তাবগুলো ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উঠতে পারে। জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেছেন, এপ্রিল ও মে মাসের মধ্যে দেশে জ্বালানি মজুত ৫০ থেকে ৬০ দিন করার কাজ চলছে। এ কারণে সরকার বিভিন্ন স্থান থেকে তেল কিনছে। তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বলেন, সময় হলে সব জানতে পারবেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারির পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ৭০-৮০ ডলারের তেল এখন ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত দেওয়ার পর তেলের বাজার কিছুটা কমেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার আবারও ১০০ ডলারের উপরে উঠে যায়। বাংলাদেশ এই যুদ্ধের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বিশেষ করে তেল নিয়ে বাংলাদেশ পড়েছে বিপাকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি এবং তেল বিতরণ কোম্পানির অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশে তেলের মজুত একেবারে আশাব্যঞ্জক নয়। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ থাকার কারণে বাংলাদেশের তেল ক্রয়ের উৎস সীমিত হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিপত্তি হলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারবে না বাংলাদেশ। তবে কয়েক দিন আগে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ১ মাসের জন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জ্বালানি বিভাগ বলছে, মার্কিন ওই নির্দেশনা শুধু রাশিয়ার তেল বোঝাই সমুদ্রে ভাসমান জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে জ্বালানি বিভাগ চাইছে ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল ক্রয়ে ২ মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নিক। এ কারণে সোমবার রাতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মুনির হোসেন চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা এক জুম বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে রাশিয়ার তেলের প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। পরে এ ব্যাপারে একটি চিঠিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মার্কিন সরকারকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, ৬ লাখ টন তেল রাশিয়া থেকে নিলে বাংলাদেশের বেশ অর্থ সাশ্রয় হবে এবং তেল নিয়ে আপাতত বড় চিন্তা থাকবে না। দেশে প্রতিবছর ৬৬ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ডিজেলই ব্যবহার হয় ৪০ লাখ টনের বেশি।

জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, এখন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা ৩৫ থেকে ৩৮ দিন। এটি মে মাসের মধ্যে ৬০ দিন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি অলস টাকা ব্যাংকে পড়ে আছে। সেই টাকার সুদ দিয়ে প্রতিবছর একেকটি কোম্পানির স্টাফরা ৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বোনাস নেন। অথচ আসল কাজ জ্বালানি তেলের মজুত বাড়াতে এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করার আগ্রহ তাদের কম। জ্বালানি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বিতরণ কোম্পানির আসল ব্যবসা তেল মজুত এবং বাজারজাত করা দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু গত ১০ বছরে তাদের আসল ব্যবসা হয়ে গেছে ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা রেখে সুদকে লভ্যাংশ দেখানো। এটা হতে পারে না। তবে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেছেন, তেলের মজুত বাড়াতে পদ্মা অয়েল কাজ করতে চায়। কিন্তু এ ব্যাপারে বিপিসি বা জ্বালানি বিভাগ এখনো কোনো নির্দেশনা দেয়নি।

সরাসরি ক্রয় নীতিতে আরও কয়েকটি প্রস্তাব : সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় সরকার কোনো টেন্ডার ছাড়াই আরও চার কোম্পানি বেরিনজিয়া, ম্যাক্সঅয়েল, সুপারস্টার ও বিএসপির কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টন তেল কেনার কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ওই কোম্পানিগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে ১০ থেকে ১৫টি তেল বিক্রির প্রস্তাব বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ যাচাই-বাছাই করেছে। সেখান থেকে ৩-৪টি প্রস্তাব আজ-কালের মধ্যে জ্বালানি বিভাগ চূড়ান্ত করতে পারে। জানা গেছে, স্পট প্রাইস অর্থাৎ তেল খালাসের দিনে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ অর্থাৎ জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয় প্রতি ব্যারেলে সাড়ে চার ডলারের প্রস্তাবকে আমলে নিচ্ছে জ্বালানি বিভাগ।

এর আগে এ অ্যান্ড এ এনার্জি থেকে ১ লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন আনার প্রস্তাব ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন হয় ১২ মার্চ। ওই কমিটির সভায় পেট্রোগ্যাসের ২ লাখ টন ডিজেল আনার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে পেট্রোগ্যাস মঙ্গলবারের মধ্যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বা জামানতের ১০০ কোটি টাকা বিপিসিকে জমা দেওয়ার কথা।

দেশে প্রতিমাসে সাড়ে ৫ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেলের দরকার হয়। যার বেশির ভাগ হচ্ছে ডিজেল। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, মার্চে ১৭টি পার্সেল বা জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ১০টি পার্সেল পাওয়া গেলেও বাকিগুলো নিয়ে কাজ করছে বিপিসি। এপ্রিলে তেল কিনতে এলসি খুলেছে ১৫টি। ইতোমধ্যে ১৩টি পার্সেল দিতে সম্মত হলেও নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে মাত্র ৩টির। এই প্রেক্ষাপটে সরকার রাশিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কেনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজেলের মজুত কিছুটা বেড়েছে। ঈদের বন্ধে ৪-৫টি জাহাজ আসার কারণে ডিজেলের মজুত ১ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।