ঈদ মানেই নতুন পোশাক, পরিবারে হাসি, আর কেনাকাটার ব্যস্ততা। তবে এই কেনাকাটার সামর্থ্য সবার এক রকম নয়। রাজধানীর ঝলমলে শপিংমলগুলোর বাইরেও আছে আরেকটি প্রাণবন্ত বাস্তবতা। মিরপুর থেকে বসুন্ধরা এলাকার আশপাশ, গাউসিয়া থেকে নতুনবাজার ফুটপাতজুড়ে গড়ে ওঠা ঈদের অস্থায়ী বিশাল এক বাজার।
ঢাকার ঈদ কেনাকাটার খোঁজ খবর নিতে, ব্যস্ততম কয়েকটি ফুটপাতে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বাজারের ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন অনুভুতির কথাই জানা যায়।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিকেল গড়াতেই শহরের প্রধান সড়কগুলো যেন রঙিন হয়ে ওঠে। সারি সারি অস্থায়ী দোকানে ঝুলছে পাঞ্জাবি, শার্ট, থ্রি-পিস, শিশুদের ফ্রক, স্যান্ডেল। বাতির আলোয় এসব দোকান যেন ছোট ছোট মেলার রূপ নেয়। দাম কম, দরদামের সুযোগ আছে আর এটাই ক্রেতাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
বাড্ডা হোসেন মার্কেট সংলগ্ন ফুটপাত এখন ঈদকেন্দ্রীক বেচাকেনায় মুখর। এখানেই দেখা মিলল রিকশাচালক সেলিম মিয়ার। তিন সন্তানের জন্য কেনাকাটা করছেন তিনি। তার কথায়, ‘শপিংমলের একটা জামার দামে এখানে তিনটা হয়ে যায়।
সেলিমের জন্য ঈদ মানে সন্তানদের মুখে হাসি। ব্র্যান্ড নয়, সাশ্রয়ই তার কাছে বড় বিষয়। ফুটপাতের এই বাজার তাকে সেই সুযোগ করে দেয়। তায় আয় কম, ব্যয় করার সামর্থ্যও কম। একারণে ২০-৫০ টাকা বাঁচাতে দর কষাকষি করেন বিক্রেতার সঙ্গে। এভাবে পছন্দের পণ্যটি কিনতে পারার আনন্দ ভেসে ওঠে তার চোখেমুখে।
বসুন্ধরা এলাকার বড় শপিংমল, যমুনা ফিউচার পার্কের বাইরেও জমে উঠেছে এধরনের ফুটপাতের কেনাবেচা। ভেতরের ঝকঝকে দোকানে ঢোকার আগে অনেকেই থামছেন বাইরের ফুটপাতে।
গার্মেন্টস কর্মী মিতু আক্তার বলেন, ভিতরে শপিং মলে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই, গেলে দাম বেশি, তাই বাইরে দেখি। খুঁজলে এখানেও ভালো জিনিস পাওয়া যায়।
তার কাছে এই কেনাকাটা শুধু প্রয়োজন নয়, বরং নিজের উপার্জনের টাকায় আনন্দ কেনার এক অনুভূতি।
গাউসিয়া মার্কেট সংলগ্ন ফুটপাত বরাবরের মতোই সবচেয়ে জমজমাট। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। বিশেষ করে নারীদের পোশাকের বৈচিত্র্য এখানে চোখে পড়ার মতো।
দোকানি আবুল হোসেন জানালেন, ‘এবার তাদের বিক্রি ভালো হচ্ছে, এসব দোকানে সব স্তরের ক্রেতার উপস্থিতির কথাও জানান তিনি। এখানে দরদাম যেন এক ধরনের সামাজিক খেলা। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে এক নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়। যেখানে শেষ পর্যন্ত দুজনেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করেন।
নতুনবাজারেও ফুটপাতের এই ঈদ বাজার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অফিসফেরত মানুষের ভিড় বেশি এখানে। বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ হাসান বলেন, সময় কম থাকে, তাই এখানে এসে দ্রুত কিনে ফেলি। আর আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য এসব ফুটপাতের দোকানে দামও হাতের মধ্যে।
ব্যস্ত নগরজীবনে এই ফুটপাত যেন সহজ, দ্রুত আর সাশ্রয়ী সমাধান। লক্ষণীয় বিষয় হলো এখন শুধু নিম্নআয়ের মানুষই নয়, মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীরাও ফুটপাতমুখী হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রাফি বসুন্ধরা ফুটপাতের ভ্যান থেকে বেছে টি-শার্ট কিনছিলেন। তিনি বলেন, ফুটপাতের কিছু জিনিস ইউনিক, আবার দামও কম।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবণতা দেখাচ্ছে, ফুটপাতের বাজার ধীরে ধীরে একটি বিকল্প ফ্যাশন স্পেস হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে।
তবে এই জমজমাট বাজারের পেছনে রয়েছে অনিশ্চয়তার গল্পও। উচ্ছেদ অভিযান, পুলিশের তদারকি সবকিছুর মধ্যেই ব্যবসায়ীদের দিন কাটে দুশ্চিন্তায়। তবুও ঈদ এলে তারা আশায় বুক বাঁধেন, কারণ এই সময়টাতেই বছরের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।
মিরপুর, বসুন্ধরা, গাউসিয়া থেকে নতুনবাজার সব ফুটপাত যেন এক সুতোয় গাঁথা। এখানে ব্র্যান্ডের চাকচিক্য নেই, আছে মানুষের প্রয়োজন, সাশ্রয়ের হিসাব, আর ছোট ছোট স্বপ্ন।
শেষ পর্যন্ত, ঈদের আনন্দটা এখানেই কম টাকায় হলেও প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টায়। আর সেই হাসি আরও বেড়ে যায় যখন ফুটপাতের দোকানের অনেক পণ্য ঘাটাঘাটি করে প্রিয়জনের জন্য পছন্দসই পণ্যটি খুঁজে পান।