Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণে বিগত সরকারকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ও তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলের হট্টগোল-ওয়াকআউট নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। তিনি আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পেলেও দলটির বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন—এ কারণেও বিরাগভাজন হচ্ছেন। আর সামাজিক মাধ্যমে আরেকপক্ষ তাকে নিয়ে ট্রল করছে।

অপরদিকে সংসদে সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে তার ভাষণকে ক্ষমতাসীন দল স্বাভাবিকভাবে নিলেও বিরোধী দলের সদস্যরা তা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি ভাষণ শুরু করতেই মারমুখী হয়ে ওঠেন তারা। রাষ্ট্রপতিকে ‘জুলাইয়ের গাদ্দার’ সম্বোধন করে লেখা বিভিন্ন  প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন তারা। তাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী ভূমিকাকে রাষ্ট্রপতি অন্ধভাবে সমর্থন দিয়েছেন। তাই তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হয়েছে। আর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালালেও তিনি ছিলেন নিষ্ক্রিয় দর্শক। তাই তার ভাষণ শুনবেন না। সেই আলোকে তারা সংসদে হট্টগোল ও ওয়াকআউট করেন।

এ ভিডিও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাদের বিপক্ষেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন। অনেকেই স্মরণ করিয়ে দেন—জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ তো এই রাষ্ট্রপতিই করিয়েছেন। তখন আজকের দুই-একজন এমপি শপথ নিয়েছেন। প্রধান বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সেই শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। তখন যদি তাকে নিয়ে আপত্তি না থাকে, তাহলে ভাষণ নিয়ে আপত্তি কেন?

আবার এই রাষ্ট্রপতি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তখন আজকের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে তির্যক মন্তব্য করেছেন। এখন আবার আগের সরকারের সমালোচনা ও এই সরকারের বন্দনা গাইছেন। সরকারের নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভূমিকারও পরিবর্তন হয়ে যায়।

মূলত দেশে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার চালু হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পদটির এমন পরিস্থিতি হয়। তিনি ইচ্ছে করলেও নিজস্ব অবস্থান নিতে পারেন না। কেউ সরকারের ইচ্ছার বাইরে গেলেও পরিণতি ভালো হয়নি। অতীতে কমপক্ষে তিন জন রাষ্ট্রপতির বেলায় এমনটি হয়েছে। মূলত যখন যে সরকার থাকে, যেভাবে চলতে বলবেন—তাকে সে অনুযায়ীই চলতে হচ্ছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির কীই-বা করার আছে? অবশ্য বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য থাকলে এমনটি হতো না।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দিয়েছেন, তা তো সরকারের পক্ষ থেকেই লিখে দেওয়া হয়েছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে তো তিনি এটি করতে বাধ্য। এর বাইরে তো তার কিছু করার নেই। এই জন্যই আমরা সব সময় ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলে আসছি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার কথা বলেছি, যাতে স্বাধীনভাবে কথা বলা যায়। আর যারা ওয়াকআউট করেছেন, তারা তা করতে পারেন। কিন্তু সংবিধান অনুসারে তো রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতেই পারেন। তারা তো আর তাকে আন্দোলন করে সরাতে পারেননি। আর তার অধীনেই তো বিগত দিনে সব ধরনের শপথ হয়েছে।’’

রাষ্ট্রপতির পদ কি শুধুই অলঙ্কারিক, সংসদের ভাষণ কি তারই প্রতিফলন?

এরশাদের পতনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর থেকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। আর রাষ্ট্রপতি হয়ে যান অলঙ্কারিক। যদিও সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান। এর ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে শুধু প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে ‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন।’

সে অনুযায়ী তিনি যেকোনও ভাষণ দিতে গেলে সরকারের নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই তার। অনেকে মনে করেন, এমন বাধ্যবাধকতার কারণে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব কোনও মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। তিনি কি শুধু সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবেন? এ নিয়েও নানা কথা উঠেছে। বিশেষ করে তাকে নিয়োগ দেওয়া দল আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিবাজ বলা। আবার অতীতে সমালোচনা করা আজকের সরকারি দলের প্রশংসা করাকে অনেকে দ্বিচারিতা বলছেন।

তবে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি পদটি অলঙ্কারিক পদ। আমাদের সংবিধান তার অবস্থান সেভাবেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই তিনি যখন যে সরকারের অধীনে থাকবেন, সে সরকারের নীতি অনুযায়ীই কথা বলবেন। আর রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুসারেই সংসদে ভাষণ দিয়েছেন। সেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে এটাই স্বাভাবিক।’’

রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বললেও প্রতিটি সরকারই তাদেরকে নিজেদের মতো চালিয়েছে। কেউ তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে। এমনকি ‘বিশ্বাসঘাতক’ উপাধি ও অপসারণও হতে হয়েছে। অতীতের এমন কয়েকটি উদাহরণও আছে। এরশাদের পতনের পর দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। তার অধীনে ৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। তার সততার মূল্যায়ন করে ৯৬ সালে বিজয়ী হয়ে তাকে রাষ্ট্রপতি করে আওয়ামী লীগ। তবে ২০০১ সালে পরাজিত হয়ে সেই আওয়ামী লীগই তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলতে ছাড়েনি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে ওই বছরের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান দলটির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এক বছর যেতে না যেতেই ২০০২ সালের ২১ জুন তাকে অপসারণ করে দলটি। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। তার স্থলে একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তাকে ‘ইয়েস উদ্দিন’ বলে সম্বোধন করতো। তবে ২০০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া দল বিএনপিও তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করে।

এ বিষয় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আক্ষরিক অর্থেই কোনও ক্ষমতা নেই। সব কিছু প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত। তাই আমরা সব সময় দুইয়ের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের দাবি করে আসছি। ঐকমত্য কমিশনেও এ ব্যাপারে জোরালো বক্তব্য রেখেছি। যতদিন এটি কার্যকর না হবে, ততদিন রাষ্ট্রপতি পদের গুরুত্ব তৈরি হবে না।’’

যা বললেন চিফ হুইপ

সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মণি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে যারা ওয়াকআউট করেছেন, তাদের বিষয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই। এটা তাদের অধিকার আছে। তবে আমার প্রশ্ন হলো—৫ আগস্টের পর তো এই রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতেই তারা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। একাধিকবার বৈঠক করেছেন। কেউ কেউ উপদেষ্টা হিসেবে তার কাছে শপথ নিয়েছেন। তখন যদি আপত্তি না থাকে, এখন কেন থাকবে। আর ভাষণে তো রাষ্ট্রপতি অনেক ভালো কথা বলেছেন। বিগত সরকারের অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কাজেই এসব বিষয়ে আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।’’