ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ইতোমধ্যে নতুন সংসদের অধিবেশনও শুরু হয়েছে। এদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরও ঘনিয়ে আসছে। এমন রাজনৈতিক ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।
সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। যেসব সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ আগে শেষ হবে, সেসব সিটিতেই নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে। সেই হিসেবে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন প্রথম ধাপেই হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আয়োজন করা হবে। মন্ত্রী এমন বক্তব্য দেওয়ার পরপরই দলীয় মনোনয়ন পেতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, রাজধানী হওয়ায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই দুই সিটিতে হেভিওয়েট, অভিজ্ঞ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের মনোনয়ন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি। বিশেষ করে গত প্রায় ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং দলীয় কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটিকে ঘিরে বিএনপি বিশেষ কৌশলগত পরিকল্পনা করছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ, বড় বড় বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর কয়েকটিতে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যাত্রাবাড়ী, কারওয়ান বাজার, উত্তরাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব থাকায় ঢাকার নিয়ন্ত্রণ শক্তভাবে ধরে রাখতে দ্রুত সিটি নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে আগ্রহী দলটি। তবে দলের একটি অংশ মনে করছে, প্রশাসনিক নিয়োগের মাধ্যমেও আপাতত ঢাকার নিয়ন্ত্রণ বিএনপির হাতেই রয়েছে। তবুও আসন্ন সিটি নির্বাচনে দলীয় কোরাম বা আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদার বাইরে গিয়ে যোগ্য, জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থী করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে যারা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সংসদ সদস্য হতে পারেননি, তাদের অনেকের নামই সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী হিসেবে কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে দলের হাইকমান্ডের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাবিথ আউয়ালের নাম। বিএনপির নেতারা মনে করছেন, বয়সে তুলনামূলক তরুণ হলেও অতীতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থাকায় ভোটের মাঠে তাকে কাজে লাগাতে পারবে দলটি। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। দলীয় অনেক নেতার মতে, তাকে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনেও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের কৌশল থাকতে পারে।
এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী, জাতীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. এম এ কাইয়ুম। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম কফিল উদ্দিন আহমেদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। দলীয় সূত্র জানায়, দলের দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি পর্বে তিনি সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৪৫০টির বেশি মামলার আসামি হয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের মুখোমুখি হলেও রাজপথ ছাড়েননি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার দিনও তিনি রাজপথে থেকে নেতাকর্মীদের নেতৃত্ব দেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই তাকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত ২৪ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ ঘোষণা দেন। এর আগে তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসক হিসেবে কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে পরবর্তী সময়ে মেয়র নির্বাচনে অংশ নিতে চান।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ থেকে সিটি নির্বাচন করব ইনশাআল্লাহ।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন এবং মহিলা দলের সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাসের নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় আলোচনায় রয়েছে।
জানতে চাইলে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন করবেন। তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। দলের জন্য যেটা ভালো হবে, আসা করছি তারা সেই সিদ্ধান্তই নেবেন। পার্টিতে আলোচনা করেই প্রার্থী মনোনয়নের বিষয় সিদ্ধান্ত নিতে নানা আলোচনা চলছে। দলের আগামীর ভাবমূর্তিই সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
এ বিষয়ে অন্তত আরও অর্ধডজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, ঢাকার জন্য দুই সিটি নির্বাচন বিএনপির জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখগুলোতে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত। বাজারসহ প্রাণকেন্দ্রগুলো বিএনপির অধীনে নেই। তাই দলের জন্য যারা আগামীতে ভাবমূর্তি বয়ে আনবে, তাদের প্রার্থী দিয়ে দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপি আগ্রহী। সংসদ অধিবেশনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যেও নির্বাচনের বিষয়ে প্রার্থী চূড়ান্তের কাজ পর্দার আড়ালে এগিয়ে নিচ্ছে দলটি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবার সংসদে যেতে পারেননি, দীর্ঘদিনে জেল, জুলুম, হামলা, মামলার শিকার হওয়া উপযুক্ত ব্যক্তিরাই দলের চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন বলে ভাষ্য হাইকমান্ডের।