যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজিরবিহীন সামরিক হুমকি ও সম্ভাব্য সর্বাত্মক হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিজেদের চরম কৌশলগত পদ্ধতি ‘মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেম’ বা বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরক্ষাকাঠামো সক্রিয় করেছে ইরান।
এর মাধ্যমে তেহরান বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আকস্মিক হামলায় কেন্দ্রীয় কমান্ড বা শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস হলেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমবে না, বরং প্রতিটি প্রদেশ হয়ে উঠবে একেকটি স্বাধীন যুদ্ধক্ষেত্র।
ইরানের এই অসম ও বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরক্ষা নীতির মূল দর্শন হলো—‘মাথা কাটা গেলেও শরীর লড়াই চালিয়ে যাবে।’
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত যুদ্ধের নিয়মের বাইরে গিয়ে ইরান এই অভাবনীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। এই কাঠামোর আওতায় ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসজ্জিত বাহিনী 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর' (আইআরজিসি)-কে ভেঙে ৩১টি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ইউনিট কেবল রাজধানী তেহরানের সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকবে এবং বাকি ৩০টি ইউনিট দেশের অন্য ৩০টি প্রদেশে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কমান্ডারদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা
মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেমের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো স্থানীয় কমান্ডারদের পূর্ণ স্বাধীনতা। সাধারণত যুদ্ধে কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের নির্দেশের ওপর ভিত্তি করে আক্রমণ পরিচালিত হয়। কিন্তু নতুন এই ব্যবস্থায়, যুদ্ধে যদি কোনো কারণে তেহরানের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কিংবা শীর্ষ নেতারা নিহত হন, তবু প্রতিরোধ এক মুহূর্তের জন্যও থামবে না।
প্রাদেশিক কমান্ডাররা তেহরানের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রোন বা মিসাইল হামলা, সামুদ্রিক আক্রমণ কিংবা গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
ভৌগোলিক ফাঁদ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ
মোজাইক আর্টের ছোট ছোট টুকরোর মতো প্রতিটি ইউনিট আলাদা কাজ করলেও, তারা একত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে একটি দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ বলয় তৈরি করবে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য শত্রুকে সম্মুখ সমরে দ্রুত পরাজিত করা নয়; বরং ইরানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও বিস্তীর্ণ মরুভূমিকে কাজে লাগিয়ে আগ্রাসী বাহিনীকে ফাঁদে ফেলা।
গেরিলা স্টাইলে হামলা চালিয়ে শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করাই এই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। এতে আগ্রাসী বাহিনীর জন্য যুদ্ধটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও হতাশাজনক হয়ে উঠবে। এই বহুমুখী যুদ্ধে নিয়মিত বাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে 'বাসিজ' মিলিশিয়াদের মতো আধা সামরিক বাহিনীও, যাদের দেশজুড়ে বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে ইরানের এমন পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে তারা যেকোনো মূল্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাই-টেক সামরিক শক্তির বিপরীতে ইরানের এই 'ডিসেন্ট্রালাইজড' কাঠামো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞরা।