এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, শনিবার তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সেই পথই বেছে নিয়েছে, যা সাধারণত বেপরোয়া রাষ্ট্রগুলো অনুসরণ করে। তারা ঠান্ডা মাথায় একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করে এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশনের কোনো তোয়াক্কা তারা করেনি। এই জঘন্য অপরাধের বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া হিসেবে এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হলো, যা একই ধরনের নিন্দনীয় প্রবণতাসম্পন্ন অন্য রাষ্ট্রগুলোও অনুসরণ করতে চাইতে পারে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী অনলাইন ডন ‘খামেনিস কিলিং’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা লিখেছে।
এতে আরও বলা হয়, প্রয়াত খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর থেকে কয়েক দশক ধরে ইরানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিপ্লব পরবর্তী ইরান ইরাকের সঙ্গে বিধ্বংসী যুদ্ধের পরিণতি মোকাবিলা করেছে। কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সহ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মুখোমুখি হয়েছে। খামেনির হত্যাকাণ্ড ইসরাইলের পূর্ববর্তী তথাকথিত ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’-এর প্রতিচ্ছবি, যেমন হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ ও হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার ঘটনা। একটি অন্তর্বর্তী শাসন পরিষদ ইতিমধ্যেই গঠন করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে- ইরান সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল।
প্রয়াত খামেনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমানের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রতিবাদ হওয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে, অপ্রত্যাশিত ছিল না। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে। এখানে লাখো মানুষ ওই আয়াতুল্লাহর ধর্মীয় নির্দেশনা অনুসরণ করতেন, যিনি একজন শিয়া মারজা ছিলেন। রবিবার করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে সহিংসতার ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কমপক্ষে ১০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন সেখানে। ইসলামাবাদেও আরও দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে শত্রুতা অব্যাহত রয়েছে। ইরানে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। আর উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি শিগগিরই শান্ত হবে- এমনটি মনে করা কঠিন।
যদিও ইরানের ক্ষোভ বোধগম্য, তবু তাদের সংযম দেখানো প্রয়োজন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইরান বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত হানছে। কিন্তু সংঘাতে সবসময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। এতে ইরান আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে- যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের কৌশলকেই শক্তিশালী করবে। বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই অধিকতর বুদ্ধিমানের কাজ।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো, বিশেষ করে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো, ইরানের পাশে দাঁড়ানো উচিত এবং তার সার্বভৌমত্বের এই চরম লঙ্ঘন ও এর দায়ীদের স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা করা উচিত। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন, পরবর্তী লক্ষ্য তারাও হতে পারে। কারণ ইসরাইল ও ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্নমত পোষণকারীদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টা অতীতে বারবার উল্টো ফল দিয়েছে। একটি দেশের জনগণই ঠিক করবে তারা কেমন সরকার চায়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যা অর্জন করেছে তা হলো মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই রক্তাক্ত দুঃসাহসিকতার জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।