মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিশ্বব্যাপী শুল্কের হার আরও বাড়িয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট তার আমদানির ওপর আরোপিত ব্যাপক শুল্কের সিদ্ধান্ত বাতিল করার কয়েক দিন পরই তিনি এই হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিলেন। শনিবার এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়াশিংটনের কাছে ইতোমধ্যে জমা দেওয়া আনুমানিক ১৩৩ বিলিয়ন ডলার ফেরত চাইছে।
ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা করেন যে, এই বর্ধিত হার "তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর" হবে। তিনি বলেন, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া "হাস্যকর, বাজেভাবে লিখিত এবং চরম আমেরিকাবিরোধী সিদ্ধান্ত" পর্যালোচনার ভিত্তিতেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ৬-৩ ভোটে আদালত রায় দিয়েছিল যে, ট্রাম্পের একতরফাভাবে শুল্ক নির্ধারণ ও পরিবর্তন করা অসাংবিধানিক, কারণ কর আরোপের ক্ষমতা একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের হাতে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের সেই শুল্কগুলো বাতিল করে দিয়েছে, যা তিনি 'ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট' (আইইইপিএ) নামক জরুরি ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে প্রায় প্রতিটি দেশের ওপর চাপিয়েছিলেন।
রায়ের পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের "বোকা ও চাটুকার" বলে কটাক্ষ করেন এবং তাদের "পরিবারের জন্য লজ্জাজনক" বলে অভিহিত করেন। এরপর তিনি দ্রুত একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন—যা ভিন্ন একটি আইন, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারার ওপর ভিত্তি করে—যার মাধ্যমে মঙ্গলবার থেকে সার্বজনীন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। শনিবার ঘোষিত ১৫ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধি এই আইনের অধীনে অনুমোদিত সর্বোচ্চ হার।
তবে কংগ্রেসের মাধ্যমে মেয়াদ বাড়ানো না হলে এই শুল্কের মেয়াদ মাত্র ১৫০ দিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। এর আগে কোনো প্রেসিডেন্ট ১২২ ধারা প্রয়োগ করেননি এবং এর ব্যবহার আরও আইনি চ্যালেঞ্জের জন্ম দিতে পারে। এ বিষয়ে কোনো নতুন বা আপডেট করা নির্বাহী আদেশ আসছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে ১২২ ধারার শুল্কের ক্ষেত্রে কিছু পণ্য—যেমন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ধাতু এবং জ্বালানি পণ্য—ছাড় পাবে।
শনিবার ট্রাম্প লিখেছেন, তার প্রশাসন অন্যান্য বৈধ শুল্ক আরোপের কাজ চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, "আগামী অল্প কয়েক মাসের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এবং আইনত অনুমোদিত শুল্ক নির্ধারণ ও জারি করবে, যা 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন'-এর অসাধারণ সফল প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।"
প্রেসিডেন্ট আগেই জানিয়েছেন, তার প্রশাসন আরও দুটি আইনের ওপর নির্ভর করতে চায়, যা জাতীয় নিরাপত্তা বা অন্যায্য বাণিজ্য প্রথার তদন্তের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পণ্য বা দেশের ওপর আমদানি কর আরোপের অনুমতি দেয়। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই শুল্কনীতি। তিনি একে বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন—যেমন দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা, মাদক পাচার রোধে অন্য দেশগুলোকে চাপে রাখা এবং যুদ্ধরত দেশগুলোকে শান্তির পথে ঠেলে দেওয়া।
এছাড়া বিদেশি সরকারগুলোর কাছ থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ে তিনি শুল্ক বা শুল্কের হুমকিকে 'লিভারেজ' বা চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফেডারেল তথ্যে দেখা গেছে, জরুরি ক্ষমতা আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট আরোপিত আমদানি কর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মার্কিন ট্রেজারি ১৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা রিফান্ড বা অর্থ ফেরতের দাবিতে হাজারেরও বেশি মামলা দায়ের করেছেন এবং আরও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। রাইস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ট্যাক্স অ্যান্ড বাজেট পলিসির পরিচালক জন ডায়মন্ড বলেন, যদিও এই দাবিগুলো আইনগতভাবে সঠিক, তবে ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য এই পথটি সহজ হবে না।
ডায়মন্ড বলেন, "এটা অনেকটা পরিষ্কার যে তারা আদালতে জিতবে, কিন্তু এতে সময় লাগবে। আদালতের আদেশ কার্যকর হলে বড় কোম্পানিগুলোর জন্য রিফান্ড পাওয়া খুব একটা ঝামেলার হবে না। তবে ছোট কোম্পানিগুলোকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে অনেক বেশি বেগ পেতে হবে।" তবে বিদেশি সরকারগুলো "প্রকৃত ঝামেলা" সামলাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ডায়মন্ড।
তিনি বলেন, "আপনি যদি তাইওয়ান বা ব্রিটেন হন এবং আপনার বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি থাকে, কিন্তু এখন তা উল্টে গেছে—তখন আপনি কী করবেন?" যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান বাণিজ্য চুক্তিতে তাইওয়ানিজ পণ্যের ওপর সাধারণ শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে (যা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সমান)। এর বিনিময়ে তাইপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি, বিমান ও সরঞ্জাম কিনতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য চুক্তিতে অধিকাংশ ব্রিটিশ পণ্যের আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে এবং ব্রিটিশ গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর উচ্চ শুল্ক কমানো হয়েছে।
‘আমেরিকান জনগণের পকেটমার’
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্পের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শুক্রবার ফক্স নিউজকে বলেন, ওই দেশগুলোকে তাদের চুক্তি মেনে চলতে হবে, এমনকি যদি চুক্তির হার ১২২ ধারার শুল্কের চেয়ে বেশিও হয়। গ্রিয়ার বলেন, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর তাদের নির্ধারিত ১৯ শতাংশ হারেই কর আরোপ করা হবে, যদিও সার্বজনীন হার এখন তার চেয়ে কম।
ইন্দোনেশিয়ার প্রধান আলোচক এয়ারল্যাঙ্গা হার্তার্তো বলেন, শুক্রবার স্বাক্ষরিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং আদালতের রায়ের পরও তা বহাল থাকবে। তবে ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর জন্য এই রায় সুখবর হতে পারে। কারণ ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের ৪০ শতাংশ শুল্ক কমানোর কোনো চুক্তি ছিল না, কিন্তু এখন তাদের শুল্ক হার অন্তত সাময়িকভাবে ১৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং পরবর্তীতে ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় সতর্ক আশাবাদ, উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেছেন, মার্চের শুরুতে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার আগে তিনি ইউরোপের একটি যৌথ অবস্থান ঠিক করবেন। অন্যদিকে হংকংয়ের আর্থিক সেবা ও ট্রেজারি সচিব ক্রিস্টোফার হিউ ট্রাম্পের নতুন শুল্ক পদক্ষেপকে "বিপর্যয়কর" বলে অভিহিত করেছেন।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আসন্ন। এরই মধ্যে গত এক বছরে অর্থনীতি সামলানো নিয়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং বা অ্যাপ্রুভাল রেটিং ক্রমশ কমেছে। সোমবার শেষ হওয়া রয়টার্স জরিপে দেখা গেছে, ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা অর্থনীতি সামলানোয় ট্রাম্পের ওপর আস্থা রেখেছেন, যেখানে ৫৭ শতাংশ আস্থা রাখেননি।
ডেমোক্র্যাটরা—যাদের নভেম্বরে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে রিপাবলিকানদের মাত্র তিনটি আসন উল্টে দিতে হবে—তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে দায়ী করেছেন। শনিবার ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকির তারা দ্রুত নিন্দা জানিয়েছেন।
হাউস ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, নতুন ঘোষিত উচ্চ শুল্কের মাধ্যমে ট্রাম্প "আমেরিকান জনগণের পকেটমারছেন"। সামাজিক মাধ্যমে তারা লিখেছেন, "তার শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার সামান্য বেশি সময়ের মধ্যে তিনি আপনার খরচ বাড়ানোর জন্য যা যা করা সম্ভব, সবই করছেন।" ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর ও ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক গ্যাভিন নিউসাম যোগ করেন, "তিনি [ট্রাম্প] আপনাদের পরোয়া করেন না।"
সূত্র : আল জাজিরা