দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আদালত দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামরিক আইন ঘোষণার ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনায় সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত তাঁকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। এই রায়ের ফলে তিনি দেশটির গণতান্ত্রিক যুগে নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সর্বোচ্চ কারাদণ্ড পেলেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার আইনে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার শাস্তি তিন ধরনের হতে পারে। মৃত্যুদণ্ড, সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা বিনাশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, পার্লামেন্ট ঘেরাও করতে সেনা মোতায়েন এবং ছয় ঘণ্টার সংকটকালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে ইউন সংবিধানিক শৃঙ্খলার ওপর ‘গুরুতর আঘাত’ করেছেন।
পুরো বিচার চলাকালে ইউন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি এই তদন্তকে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষ্য, তৎকালীন বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি এক অসাংবিধানিক পার্লামেন্টারি একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছে—এ কথা নাগরিকদের জানাতেই তিনি সামরিক আইন জারি করেছিলেন।
ইউন কোনো প্রমাণ ছাড়াই নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, বিরোধী দল বাজেট কাটছাঁট ও অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর সরকারকে পঙ্গু করে দিয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, তিনি সীমিতসংখ্যক এবং বেশির ভাগ নিরস্ত্র সেনা মোতায়েন করেছিলেন। পার্লামেন্ট দমন করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর আইনজীবীরা বলেন, ‘সংবিধানিক শৃঙ্খলা ভাঙার কোনো অভিপ্রায় ছিল না, কোনো দাঙ্গাও হয়নি।’
বিদ্রোহের ১৪ মাস পর এই রায় ঘোষণা করা হলো। কয়েক দশকের মধ্যে এটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
অভিযোগের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতের ঘটনায়। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, সেদিন ইউন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আইনসভাকে অচল করতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেপ্তার করতে এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন। ইউন দাবি করেন, তিনি ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ নির্মূল করছিলেন। তবে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
সামরিক আইন ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৯০ জন আইনপ্রণেতা সামরিক ও পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে জরুরি প্রস্তাব পাস করেন। সেই প্রস্তাবে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। ১১ দিনের মধ্যে পার্লামেন্ট ইউনকে অভিশংসন করে। ৪ মাস পর সাংবিধানিক আদালত তাঁকে পদ থেকে অপসারণ করে।
বৃহস্পতিবারের এই রায়ের আগে আরও কয়েকটি সংশ্লিষ্ট রায় হয়েছে। সেসব রায়ে ৩ ডিসেম্বরের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হান ডাক সুকে ২৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই রায়ে সামরিক আইন প্রয়াসকে নির্বাচিত ক্ষমতার ‘স্ব-অভ্যুত্থান’ বলা হয়, যা প্রচলিত অভ্যুত্থানের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। রাষ্ট্রপক্ষ ১৫ বছর কারাদণ্ড চেয়েছিল। কিন্তু আদালত তার চেয়ে অনেক বেশি সাজা দেন। এতে কঠোর শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অবস্থান স্পষ্ট হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লী সাং মিনকে বিদ্রোহে ভূমিকার দায়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধের নির্দেশ পৌঁছে দিয়েছিলেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব রায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে ইউন–এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।
এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক জিউন হি ২০১৮ সালে দুর্নীতি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধে মোট ৩২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। পরে আপিলে সেই সাজা কমানো হয়। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে তাঁর সাজা বাতিল হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে সামরিক শাসক চুন দো–হুয়ান ও রোহ তায়ে–ও ১৯৭৯ সালের অভ্যুত্থান এবং গুয়াংজু হত্যাকাণ্ডে ভূমিকার জন্য যথাক্রমে মৃত্যুদণ্ড ও সাড়ে ২২ বছরের কারাদণ্ড পান। পরে আপিলে সেই সাজা কমানো হয়। শেষ পর্যন্ত দুজনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমা পান।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে যেসব প্রেসিডেন্ট কারাদণ্ড ভোগ করেছেন, শেষ পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমা পেয়েছেন।