Image description
 

দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ এখন ইরানের সামরিক পাল্লার মধ্যে অবস্থান করছে। একটি, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন, ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। আরেকটি, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে মোতায়েন করা হয়েছে। তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এমন ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যাতে কোনো দ্ব্যর্থতার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আমেরিকান শক্তি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে সফল হবে না।

 

তিনি সতর্ক করে দেন, একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও ডুবিয়ে দেওয়া হতে পারে।

এই দুই সংকেত—অভূতপূর্ব সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ—এর মাঝখানে নীরবে এগিয়ে চলছে একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা উত্তেজনা এড়াতে আবার আলোচনায় বসেছেন।

মূল প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই সংঘাতের পূর্বাভাস, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী চক্রাকার উত্তেজনার আরেকটি অধ্যায়?

ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন এনডিটিভিকে বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুতর মুহূর্ত। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে, আর ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন—চুক্তি না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।

সংঘাতের ঝুঁকি

জুন মাসে ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ফলে বর্তমান শক্তি প্রয়োগের হুমকি নিছক কথার কথা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অধ্যাপক ম্যাবন বলেন, আলোচনার মূল সমস্যা হলো—ওয়াশিংটন আসলে কী চায়, তা স্পষ্ট নয়। চুক্তির পরিধি কী হবে, তা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তিনি এটিকে “চাপ সৃষ্টির কূটনীতি” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা ভুল বোঝাবুঝির মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃত সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

ইরানের দ্বিধা

ইরান হুমকি দিয়েছে যে তারা অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করতে পারে। কিন্তু অনেক মার্কিন ঘাঁটি এমন দেশে অবস্থিত, যাদের সঙ্গে ইরানের তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পূর্বের হামলা দোহা-তেহরান সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

অধ্যাপক ম্যাবনের মতে, ইরান এক ধরনের ফাঁদে পড়েছে। শক্ত অবস্থান না নিলে দুর্বল দেখাবে, আবার অতিরিক্ত আগ্রাসন দেখালে কূটনৈতিক ক্ষতি হবে।

দরকষাকষির তাস

উপসাগরীয় দেশগুলো—সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমান—উত্তেজনা এড়াতে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পারমাণবিক কর্মসূচি থাকলেও, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও হিজবুল্লাহ-হামাসের মতো গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থনও আলোচ্যসূচিতে আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও উদ্বিগ্ন।

অভ্যন্তরীণ চাপ

ইরান বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মুখে রয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম শতভাগের বেশি বেড়েছে। এই পরিস্থিতি তেহরানের দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত করছে।

অধ্যাপক ম্যাবন বলেন, শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা এখানে মূল প্রশ্ন। শুধু খামেনির নয়, পুরো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে।

প্রক্সি নেটওয়ার্কের দুর্বলতা

হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়েছে। হুথিরা তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত। ইরাকি মিলিশিয়াদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। ফলে ইরানের তথাকথিত “প্রতিরোধ বলয়” আগের মতো শক্তিশালী নয়।

তবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ইরানকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কিছুটা সহায়তা দিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীর হুমকি

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভূগোল—হরমুজ প্রণালী। এটি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট।

অধ্যাপক ম্যাবন বলেন, উত্তেজনা বাড়লে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়তে পারে।

বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল এবং প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় আলোচনা চলছে। ইরান বলছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার অ-আলোচনাযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র শূন্য সমৃদ্ধকরণ চায় এবং আলোচনার পরিধি বাড়াতে আগ্রহী।

ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইতিবাচক বার্তা এলে তা আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকেই আগে আসতে পারে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন উচ্চঝুঁকির এক রাজনৈতিক জুয়ার মতো—যেখানে ভুল পদক্ষেপ আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক সংকটে রূপ দিতে পারে।

সূত্র- এনডিটিভি