মৃত ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য স্বজনরা তাদের মরদেহ তুলে দিতেন ‘রিটার্ন টু নেচার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিল অর্থের বিনিময়ে মরদেহ সৎকার করা। প্রতিটি দেহ সৎকারের জন্য তারা ১ হাজার ২০০ ডলার বা তার চেয়ে বেশি অর্থ নিত। মরদেহ ও অর্থ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পর নিজ দায়িত্বেই সৎকারের কাজটি করত প্রতিষ্ঠানটি। নির্দিষ্ট সময় পর মরদেহ দাহ করার প্রমাণ হিসেবে স্বজনদের হাতে তুলে দিত ছাই।
সম্প্রতি জানা যায়, অর্থ নিলেও এসব মরদেহ সৎকার করত না প্রতিষ্ঠানটি। যে ছাই প্রমাণ হিসেবে স্বজনদের দেওয়া হতো, তা মূলত কাঠ-কয়লা পোড়ানো ছাই। আর মরদেহগুলো ফেলে রাখা হতো একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতরে। মরদেহ সৎকার না করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করতেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক জন হলফোর্ড ও তার সাবেক স্ত্রী ক্যারি হলফোর্ড। এই অর্থে চলত তাদের বিলাসী জীবনযাপন।
শুক্রবার এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক জন হলফোর্ডকে ৪০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। তার বিরুদ্ধে সৎকারের জন্য আনা ১৮৯ মরদেহ লুকিয়ে রেখে স্বজনদের ভুয়া ছাই বুঝিয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। এ ঘটনার জন্য দায়ী তার প্রাক্তন স্ত্রী ক্যারি হলফোর্ডের সাজা এখনো ঘোষণা হয়নি। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ এপ্রিল তার সাজার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবর জানায়, প্রায় চার বছর ধরে একটি বাড়িতে মরদেহগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন জন হলফোর্ড ও তার প্রাক্তন স্ত্রী ক্যারি হলফোর্ড। গত ডিসেম্বরে আদালতে তারা স্বীকার করেন, মরদেহগুলো সৎকার না করে দুজনের যোগসাজশে সেগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কলোরাডো স্প্রিংসের শহরতলী এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে দেহগুলো স্তূপ করে রেখেছিল হলফোর্ড দম্পতি। ২০২৩ সালে ভবনটি থেকে দুর্গন্ধের অভিযোগ পেয়ে তদন্তকারীরা সেখানে যান। পরিদর্শন শেষে তারা জানান, ভবনটিতে ঢুকতেই দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে মরদেহ। প্রাপ্তবয়স্ক, নবজাতক, ভ্রূণসহ সব ধরনের মরদেহই সেখানে ছিল।
২০২৪ সালে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ফিউনারেল হোম পরিচালনার ঢিলেঢালা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে আইন পাস করেন কলোরাডোর আইনপ্রণেতারা। ওই বছরের মে মাসে পাস হওয়া বিলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয় এবং কোনো ফিউনারেল হোম বন্ধ হয়ে গেলেও সেখানে নিয়মিত পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়।
এদিকে সাজা ঘোষণার আগে আদালতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অভিযোগ করে, তাদের স্বজনদের মরদেহের সঙ্গে যা হয়েছে, তা খুবই মর্মান্তিক। পচে যাওয়া মাংস ও কীটের বিভীষিকাময় দৃশ্য তাদের তাড়া করছে। এ ঘটনায় তারা আসামি জন হলফোর্ডকে ‘দানব’ আখ্যা দিয়ে তার অন্তত ৫০ বছরের কারাদণ্ডাদেশের আবেদন জানান।
শুনানি শেষে আদালতে বিচারক এরিক বেন্টলি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই ভালো কিছু থাকে। কিন্তু আমরা এমন এক দুনিয়ায় বাস করি, যা প্রতিদিন এই বিশ্বাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আপনার অপরাধ আমার এই বিশ্বাসকেই চ্যালেঞ্জ করছে।’
অভিযুক্ত হলফোর্ড আদালতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বাকি জীবন নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত থাকবেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমার সুযোগ ছিল, এটা এড়ানোর। কিন্তু আমি তা করিনি। আমি যা করেছি, তা ঠিক হয়নি।’
আসামির আইনজীবী বলেন, ‘এটি সহিংস অপরাধ নয়। অভিযুক্তের আগে কোনো অপরাধের রেকর্ডও নেই। তাই আদালতের কাছে অনুরোধ, তার অপরাধকে যেন লঘু করে দেখা হয়।’
তবে প্রসিকিউটর শেলবি ক্রো বলেন, ‘স্পষ্টতই এটি লোভপ্রসূত অপরাধ। হলফোর্ড দম্পতি প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে যে অর্থ নিতেন, তা দিয়ে এসব মরদেহ বহুবার দাহ করা যেত।’