Image description
 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি এমন এক উদ্যোগ যা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও কাজ করবে।

শুরুতে বলা হয়েছিল, গাজা উপত্যকায় শাসন কাঠামো পরিচালনার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করা হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি উদ্যোগটির একটি নথি হাতে পেয়েছে মিডল ইস্ট আই। সেখানে ফিলিস্তিন বিষয়ক তথ্য উল্লেখ নেই। বরং আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

 
 

নথিতে বলা হয়েছে, ‘বোর্ড অব পিস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। যা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, নির্ভরযোগ্যতা ও আইনের শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিতে কাজ করবে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তখনই কার্যকর হবে যখন কোনো কিছুর বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সমাধান করা হবে।’

বোর্ড অব পিসের চেয়ারম্যান হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্তৃত ক্ষমতার অধিকারী হবেন। তাঁর হাতে কোনো দেশকে সদস্য করা কিংবা অপসারণের ক্ষমতা থাকবে। বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্ত তখনই বাতিল হবে, যখন দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। প্রথম বছরে ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার মাধ্যমে কোনো দেশ ৩ বছরের জন্য বোর্ডের সদস্য হতে পারবে। 

 

উদ্যোগটির ধারণা প্রকাশের পর থেকে, কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানকে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, প্রথমে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। গত রোববার মিসর, ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশও আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তারা যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বোর্ডে থাকবেন কি না তা সোমবার পর্যন্ত জানা যায়নি।

গাজার জন্য ‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ কী
১৬ জানুয়ারি গাজা উপত্যকার জন্য ‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ এর ধারণা প্রকাশ করে হোয়াইট হাউস। এটি হলো অঞ্চলটির পরবর্তী সরকার গঠন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি সংস্থা। কূটনীতি, উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক কৌশলগত ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সাতজন ব্যক্তিকে এই এক্সিকিউটিভ বোর্ডে রাখা হয়েছে।

প্রত্যেক সদস্যকে গাজায় স্থিতি স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সম্পর্ক তৈরি, পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ তহবিল সংগ্রহ ও তা ব্যবহারের কাজ করবেন। তবে নির্বাচিত সাত ব্যক্তির কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন তা সোমবার পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এক্সিকিউটিভ বোর্ডের প্রতিদিনের কাজ ‘বোর্ড অব পিস’কে জানানোর জন্য দুজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাও নিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া, গাজার জন্য একজন হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং স্থিতি রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক বাহিনীর (আইএসএফ) কমান্ডারের নামও ঘোষণা করা হয়েছে। 

হোয়াইট হাউসের এই ঘোষণাগুলো এরই মধ্যে ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, এক্সিকিউটিভ বোর্ডের কোনো সদস্যই ফিলিস্তিনি না। পুরুষ সদস্যদের মধ্যে সবাই ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ। বোর্ড নিয়ে হামাস তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও গাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম পক্ষ ইসলামিক জিহাদ বলেছে, এটি কেবল ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করবে।

এক্সিকিউটিভ বোর্ডের ৭ সদস্য কারা
‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ডের’ সদস্য তালিকায় প্রথম নামটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। এরপরে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে জামাই জ্যারেড কুশনার। বাকি সদস্যদের মধ্যে আছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় ভাঙ্গা, বিলিয়নিয়ার ও অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক রোয়ান ও রোবার্ট গ্যাব্রিয়েল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন গ্যাব্রিয়েল। মার্ক রোয়ানের প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত। টনি ব্লেয়ারের সময় যুক্তরাজ্য ইরাক যুদ্ধে জড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি দূত থাকাকালে তিনি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়পক্ষের দ্বারা সমালোচিত হন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি যুক্তরাজ্যে ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ডের (জেএনএফ) হয়ে কাজ করেছেন। কূটনীতিতে অনভিজ্ঞ স্টিভ উইটকফ একজন ইহুদি-আমেরিকান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার। আর মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

বোর্ড অব পিসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কারা
নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন আরিয়েহ লাইটস্টোন ও জোশ গ্রুয়েনবাউম। লাইটস্টোন ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ইসরায়েলে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি অবৈধ ইসরায়েলি বসতি আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক। এছাড়া, তিনি বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

জোশ গ্রুয়েনবাউম সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গাজা রিভিয়েরা’ পরিকল্পনায় জেরার্ড কুশনারের সঙ্গে কাজ করেছেন।

গাজা প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি কী
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ প্রতিষ্ঠিত হয় গত বছরের অক্টোবরে। ১৫ জানুয়ারি এটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হলেও কমিটির সদস্যদের তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। তবে মিডল ইস্ট আইয়ের দেখা একটি তালিকা অনুযায়ী, কমিটির নেতৃত্ব দেবেন ফিলিস্তিন পরিকল্পনা বিষয়ক সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাথ।  

গত রোববার সাংবাদিকদের আলি শাথ জানান, এই সংস্থা গাজায় মূল পরিষেবা পুনঃস্থাপন এবং ‘শান্তির সমাজ’ গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। শাথ বলেন, এই সংস্থা বোর্ড অব পিসের নির্দেশনা মেনে কাজ করবে। সহায়তা করবেন দুজন হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ। সংস্থাটি অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের মনোবল ফিরিয়ে আনতেও কাজ করবে।