বারো বছর আগে, উত্তরপ্রদেশের গাজীপুরের একটি ছোট গ্রাম রানিপুরে, দীপমালা সরপঞ্চের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে এমন একটি প্রশ্ন করেছিলেন যা আগে কেউ করার সাহস পায়নি। যদিও সরপঞ্চ ছিলেন একজন নারী, কিন্তু আসল ক্ষমতা ছিল তার স্বামীর হাতে, যিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তাদের বাড়িতে একটি গর্তযুক্ত পায়খানা ছিল যা অন্য কাউকে দিয়ে হাতে পরিষ্কার করানো হতো, কারণ সেই বাড়ির নারীদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। উঠানে চলাকালীন এক সভার সময় দীপমালা জানতে পারেন যে, তার নিজের মাসিকেই সেই পায়খানা পরিষ্কার করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
দীপমালা এর প্রতিবাদ করলে সরপঞ্চ তাকে অহেতুক ঝামেলা সৃষ্টির দায়ে অভিযুক্ত করেন। দমে না গিয়ে দীপমালা বলেন, "আপনারা যা করছেন তা যদি সঠিক হয়, তবে সেটা লিখে পুলিশকে দিন। তাদের বলুন যে আমাদের এই প্রথাটি ন্যায়সঙ্গত।" সরপঞ্চের পরিবার তার কথা উড়িয়ে দেয় এবং তাদের ছেলে তাকে হুমকি দিয়ে বলে যেন সে আর কোনোদিন ওই গ্রামে পা না রাখে।
এই লড়াই দীপমালার জন্য নতুন কিছু ছিল না। মোহাম্মাদাবাদে এমন এক সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়েছিলেন যারা প্রজন্ম ধরে হাতে ময়লা পরিষ্কারের কাজে বাধ্য ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রশ্ন করতেন, "শুধু আমরাই কেন? কেন এই কাজ? আমাদের কেন সব সময় অস্পৃশ্য থাকতে হবে?" এই প্রশ্নগুলোই তাকে পথ দেখিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সরপঞ্চের উঠান পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল।
দুই মাস পর দীপমালা জানতে পারেন যে, সেই পায়খানাটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে যাতে কাউকে আর হাতে ময়লা পরিষ্কার করতে না হয়। কাঠামোটি ছোট হলেও এর মাধ্যমে আসা পরিবর্তনটি ছিল বিশাল। এই ঘটনাটি তার সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং তাকে আরও মানুষের সাথে কথা বলতে ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে অনুপ্রাণিত করে। অনেকে বাধা দিয়ে বলতেন, "আমরা যদি এই কাজ বন্ধ করি, তবে বাচ্চাদের খাওয়াবো কী?" তিনি পালটা প্রশ্ন করতেন, "অন্যরা যদি অন্য কাজ করে বেঁচে থাকতে পারে, তবে আমাদের সন্তানদের কেন এই উত্তরাধিকার বইতে হবে?"
জাতপাত বা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি আরও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তিনি বুঝতে পারেন জাতপাত এবং লিঙ্গ বৈষম্য কতটা গভীরভাবে একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। তার বস্তিতে মেয়েদের 'চৌরাস্তা' পার হওয়ার অনুমতি ছিল না। পরিবারগুলো হয়রানি, অপহরণ এবং লোকলজ্জার ভয় পেত। এমনকি ডিগ্রিধারী মেয়েরাও অনেক সময় এক প্যারাগ্রাফ পড়তে পারত না; কারণ শিক্ষা ছিল কেবল বিয়ের টিকিট, স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যম নয়। দীপমালা নিজের জীবনের গল্প দিয়ে এই মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি জানান কীভাবে তার বাবা তাকে পড়াশোনার জন্য এলাহাবাদ পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। তিনি পারলে অন্য মেয়েরা কেন পারবে না? তার এই প্রশ্নগুলো মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
দীপমালার দৃঢ় সংকল্প পরিবর্তনের বীজ বপন করেছিল। পরিবারগুলো ঘোষণা করতে শুরু করে যে তারাই হবে এই অমানবিক কাজের শেষ প্রজন্ম এবং তাদের সন্তানরা এই অভিশপ্ত জীবন উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে না। যে মেয়েরা একসময় লোকচক্ষুর আড়ালে থাকত, তারা বাইরে বের হতে শুরু করে। আজ তার বস্তির কন্যারা বেনারস, লখনউ এবং এলাহাবাদে পড়াশোনা করছে, কলেজে ভর্তি হচ্ছে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে যা তাদের মায়েরা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি।
তার কাজ এখন কেবল নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দীপমালা বর্তমানে 'গ্লোবাল চ্যাম্পিয়ন্স ফর দলিত উইমেন'-এর সাথে কাজ করছেন। তিনি স্বতন্ত্রভাবে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথেও যুক্ত আছেন। 'দিসোম ফেলো' হিসেবে কাজ করার সময় তিনি 'উই দ্য পিপল অভিযান'-এর সাথে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে তিনি সাধারণ আলাপচারিতাকে কীভাবে গঠনমূলক আলোচনায় রূপান্তর করতে হয় এবং মানুষের কাছে সাংবিধানিক অধিকার সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে হয় তা শেখেন। এই দক্ষতাগুলো তার কাজের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তরুণদের নিয়ে তিনি 'আম্বেদকর সোশ্যাল ক্যাফে' শুরু করেছেন, যা বিতর্ক, শেখা এবং সাম্যের স্বপ্ন দেখার একটি ক্ষেত্র।
দীপমালার সম্প্রদায়ের এই পরিবর্তনের গল্পটি সহজ বা সরল ছিল না। এটি ছিল হুমকি আর সাহসের, বাধা আর আশার এবং ধীরগতি ও আকস্মিক সাফল্যের এক সংমিশ্রণ। কখনও কখনও তার নিজের লোকেরাই তার বিরোধিতা করেছে। কখনও সংস্থাগুলো তাকে সহায়তা করতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু তিনি একটি বিশ্বাসেই অটল ছিলেন: পরিবর্তন সম্ভব।
