Image description
 

ইরানের নজিরবিহীন বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বিক্ষোভকারীদের সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে তেহরানের প্রতি চরম মারমুখী অবস্থানে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে হঠাৎ করেই তার কণ্ঠে কিছুটা নমনীয়তার সুর পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার কাছে তথ্য রয়েছে যে ইরানে বর্তমানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং বড় আকারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা ইরান সরকারের নেই। কিন্তু হোয়াইট হাউসের এ মৌখিক ‘নমনীয়তা’ বা সুর বদল আসলে কতটা কৌশলগত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, একই সময়ে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য অভিমুখে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে পেন্টাগন। একদিকে ‘ভালো খবর’ বলে টুইট করা, অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে রণতরী মোতায়েন—ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে এক নতুন রহস্য ও উত্তেজনার আবর্তে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তেহরানও এবার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।

এদিকে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকলেও পরিস্থিতি যে ভয়াবহ, তা স্পষ্ট।

গত তিন সপ্তাহের বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেছে কোনো কোনো মানবাধিকার সংস্থা। এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ‘সুর বদল’ আদতে ইরানকে কোনো ছাড় দেওয়া, নাকি বড় কোনো সামরিক অভিযানের আগের নিস্তব্ধতা—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এর মধ্যেই মার্কিন ও ব্রিটিশ কূটনীতিকদের কাতার ও তেহরান থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এক বৃহত্তর সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

‘ভালো খবরে’ ট্রাম্পের সুর বদল: বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বস্ত সূত্র’ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ড অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২৬ বছর বয়সী তরুণ এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হওয়ার খবরকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প তার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘এটি একটি ভালো খবর। আশা করি এটি অব্যাহত থাকবে।’

 
 

এর আগে ট্রাম্প ইরান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যদি কোনো বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তবে ইরানকে তার জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে। কিন্তু তেহরান যখন জানাল যে, তাদের এখন কোনো ফাঁসি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই, তখন ট্রাম্পের ভাষায় কিছুটা পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। তবে তিনি এও স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তিনি বলেছেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি যে সেখানে আসলে কী ঘটছে।’

 

মধ্যপ্রাচ্যের পথে মার্কিন রণতরী: ট্রাম্পের কণ্ঠে শান্তির সুর শোনা গেলেও মার্কিন সামরিক তৎপরতা ভিন্ন কথা বলছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং তার সঙ্গে থাকা ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’কে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে সরিয়ে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই স্ট্রাইক গ্রুপে রয়েছে অত্যাধুনিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে এই রণতরীটি সেখানে অবস্থান করছিল। কিন্তু ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিকে সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতায় আনা হচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখছে, অন্যদিকে তেহরানকে চাপে রাখতে জলপথে শক্তি বৃদ্ধি করছে। ৮ জানুয়ারি এই রণতরী থেকে লাইভ-ফায়ার ড্রিল বা তাজা গুলিবর্ষণের মহড়া চালানো হয়েছিল, যা এর যুদ্ধের প্রস্তুতিরই প্রমাণ দেয়।

রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ইরানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার নিহতের তথ্য: ইরানে এবারের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল গত ডিসেম্বরের শেষে ইরানি মুদ্রার ভয়াবহ দরপতনের প্রতিবাদে। কিন্তু দ্রুতই তা দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর)’ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) বলছে, নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৪৩৫ জন।

তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের একটি বড় অংশই তরুণ এবং তাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর মেশিনগান ব্যবহার করছে।

এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত: ইরানে চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রে ছিলেন ২৬ বছর বয়সী পোশাক ব্যবসায়ী এরফান সোলতানি। তেহরানের পার্শ্ববর্তী ফারদিস থেকে তাকে আটক করার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার খবরে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। এমন পরিস্থিতি ইরানি বিচার বিভাগ এখন দাবি করছে, এরফান সোলতানিকে কখনোই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো কেবল কারাদণ্ডযোগ্য। তবে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এটি ইরানের একটি কৌশল। আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে তারা সাময়িকভাবে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখলেও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির পরই ইরান সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছে।

ইরানে রেজা পাহলভি গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান ট্রাম্প: ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভিকে সমর্থন দেবেন কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বলেন, ‘তিনি (রেজা পাহলভি) খুব চমৎকার মানুষ, কিন্তু তার দেশ তাকে গ্রহণ করবে কি না, তা আমি জানি না।’

তবে ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, যে কোনো সরকারেরই পতন হতে পারে এবং ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। যদিও তিনি সরাসরি শাসন পরিবর্তনের কথা বলেননি, তবে ‘বিক্ষোভ চালিয়ে যান’ এবং ‘সহায়তা আসছে’ বলে তার আগের মন্তব্যগুলো আন্দোলনকারীদের সাহস জুগিয়েছে।

তেহরানের হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা: এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর পদক্ষেপকে ভালো চোখে দেখছে না তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘জুন মাসের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না।’ এর আগে গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে অঞ্চলটি যুদ্ধের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল।

আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ফের কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এ হুমকির পরপরই কাতারস্থ আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে আংশিক কর্মী প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ওদিকে জার্মানি, ইতালি ও পোল্যান্ড তাদের নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। লুফথানসার মতো বিমান সংস্থাগুলো এখন ইরান ও ইরাকের আকাশপথ এড়িয়ে চলছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানকে নিয়ে ট্রাম্প নতুন কৌশলে এগোচ্ছেন। একদিকে তিনি ইরানের নমনীয় হওয়ার দাবিকে স্বাগত জানিয়ে সুর নরম করছেন, অন্যদিকে আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো রণতরী পাঠিয়ে সামরিক প্রস্তুতির জানান দিচ্ছেন। তেহরান বর্তমানে একদিকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সামরিক চাপের মুখে পড়ে এক কঠিন সময় পার করছে। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছাবেন, নাকি ২০২৫ সালের জুনের মতো আরও একটি সংঘাতের সূচনা হবে—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েকদিনের পরিস্থিতির ওপর।