মিসর, লেবানন ও জর্ডানে মুসলিম ব্রাদারহুডের তিনটি শাখাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ নির্দেশে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে নতুন করে টানাপোড়েনে ফেলেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা। খবর আল-জাজিরার।
১৩ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট মিসর ও জর্ডানের মুসলিম ব্রাদারহুডকে ‘স্পেশালি ডিজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র দপ্তর লেবাননের মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ সংগঠন আল-জামা’আ আল-ইসলামিয়াকে আরও কঠোর ‘ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন (এফটিও)’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে সংগঠনগুলোর অর্থনৈতিক লেনদেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, মুসলিম ব্রাদারহুডের এসব শাখা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও আড়ালে তারা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসসহ ইসরায়েলবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ট্রেজারি বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়, এই তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
তবে মুসলিম ব্রাদারহুড এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সালাহ আবদেল হক ঠিকানাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর পেছনে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চাপ রয়েছে। তার দাবি, সংগঠনটি কখনো সন্ত্রাসে জড়িত ছিল না এবং আইনি পথে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো হবে।
১৯২৮ সালে মিসরের ইসলামি চিন্তাবিদ হাসান আল-বান্নার প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদারহুড মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইসলামের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত। মিসরে সংগঠনটি ২০১২ সালে দেশের ইতিহাসের একমাত্র গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ক্ষমতায় এলেও এক বছরের মাথায় সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর থেকেই কায়রো মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করে ব্যাপক দমন অভিযান চালিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণাকে মিসর সরকার স্বাগত জানিয়েছে এবং একে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ বলে উল্লেখ করেছে।
লেবাননে আল-জামা’আ আল-ইসলামিয়া দীর্ঘদিন ধরে একটি বৈধ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে সক্রিয় এবং সংসদেও তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ার ফল নয় এবং লেবাননের অভ্যন্তরে এর কোনো আইনি বৈধতা নেই। তারা সরাসরি অভিযোগ করেছে, এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার অংশ।
জর্ডানেও মুসলিম ব্রাদারহুড দীর্ঘদিন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাদের রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পেলেও পরে সরকার সংগঠনটি নিষিদ্ধ করে। ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দিল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই ঘোষণার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পড়তে শুরু করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান রাজনীতিকদের আহ্বানে টেক্সাস ও ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসকে (কেইর) মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়েছে। কেইর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আইনি লড়াই শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করা কেবল একটি নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-কেন্দ্রিক কৌশল, আরব স্বৈরতান্ত্রিক মিত্রদের স্বার্থ এবং রাজনৈতিক ইসলামকে কোণঠাসা করার বৃহত্তর নীতিরই প্রতিফলন। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর করবে বলেই মনে করছেন তারা।