আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে দেশে সামরিক ড্রোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে একটি বড় চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে ‘আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) উৎপাদন কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিলেছে।
অনুমোদিত নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি আমদানি ও স্থাপনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয় হবে ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা চার অর্থবছরে পরিশোধ করা হবে। চলতি অর্থবছরে ১০৬ কোটি টাকা, ২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮ অর্থবছরে প্রতিটিতে ১৫৫ কোটি টাকা করে এবং ২০২৮–২৯ অর্থবছরে প্রায় ১৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি প্রায় ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এলসি খোলা, ভ্যাট ও সুইফট চার্জ বাবদ দেশীয় মুদ্রায় ব্যয় হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা ও ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি) ইন্টারন্যাশনালের প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে ড্রোন উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ড্রোন কারখানা স্থাপন বা যুদ্ধবিমান আমদানির বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চান না তিনি। বিষয়গুলো চূড়ান্ত হলে বিস্তারিত জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক আয়শা সিদ্দিকা জানান, এ বিষয়ে এখনো বিমান বাহিনী থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের আগে প্রধান উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের জন্য বিমান বাহিনীকে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে না। প্রতিবছর ‘অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি’ খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেখান থেকেই ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
এর আগে সশস্ত্রবাহিনীর গঠিত একটি যৌথ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে ২০২৪–২৫ থেকে ২০২৭–২৮ অথবা ২০২৫–২৬ থেকে ২০২৮–২৯ অর্থবছরের মধ্যে অর্থ পরিশোধের শর্তে ড্রোন উৎপাদন কারখানা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায়ও চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশে ইউএভি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় পাঁচটি শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—চলতি অর্থবছরের ব্যয় বিদ্যমান বরাদ্দের মধ্যেই সমন্বয় করতে হবে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া যাবে না। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরগুলোতেও বিমান বাহিনীর নির্ধারিত বাজেট সীমার মধ্যেই ব্যয় পরিচালনা করতে হবে। সব অর্থ ব্যয় প্রচলিত আর্থিক বিধি-বিধান অনুসরণ করে এলসির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে এবং এই অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করা যাবে না।
প্রসঙ্গত, শুরুতে সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল জাহাজ ভাড়াসহ মোট ৬৪৩ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয়। তবে গত নভেম্বরে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিমূল্য কমিয়ে ৬০৮ কোটি ৭ লাখ টাকায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, এটি চীনের একমাত্র বৃহৎ প্রযুক্তি করপোরেশন, যার কার্যক্রম ইলেকট্রনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রায় সব খাতে বিস্তৃত। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে রাডার, যোগাযোগ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ইউএভি সরঞ্জামসহ নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য ও সেবা বর্তমানে বিশ্বের ১১০টিরও বেশি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।