একসময় গাইবান্ধার ৫টি আসনই জাতীয় পার্টি (জাপা) ও আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ এবার ভোটের মাঠে নেই। তাদের দীর্ঘদিনের সঙ্গী জাতীয় পার্টির অবস্থাও সঙ্গীন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ ও গাইবান্ধা-৫ আসন দুটি থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা আসন দুটি থেকে তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণাও করেছে।
গাইবান্ধা-১ আসনটি জেলার সুন্দরগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত। এই আসনে শামীম হায়দার পাটোয়ারী ২০১৮ সালে শূন্য আসনটিতে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেরও তিনি মহাজোটের শরিক হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
বিগত নির্বাচনে যাঁরা শামীম হায়দার পাটোয়ারীর সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের অনেককেই এখন এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর আসন দুটিতে প্রচার-প্রচারণায় কে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তা এখনো অস্পষ্ট। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আসন দুটির একটিতেও এখনো ভোটের মাঠে নামেননি জাতীয় পার্টির এই শীর্ষ নেতা।
এদিকে সুন্দরগঞ্জ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনয়ন দিয়েছে তাদের হেভিওয়েট প্রার্থী অধ্যাপক মাজেদুর রহমান মাজেদকে। এই এলাকাটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ‘জামায়াত অধ্যুষিত’ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধ্যাপক মাজেদুর রহমান মাজেদ ব্যক্তি হিসেবেও জনপ্রিয়।
সাধারণ ভোটারদের দাবি, শামীম হায়দার পাটোয়ারী সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেননি। উপজেলার তারাপুরের ভোটার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এবার এলাকার লোকজন আওয়ামী লীগের কোনো সঙ্গীকে ভোট দেবে না।’
আরেক ভোটার তাজমল আলী বলেন, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের বিদায়ের পর জাতীয় পার্টির অবস্থা হয়েছে মা-হারা সন্তানের মতো। তাদের দায়িত্ব কেউ নিতে চাচ্ছে না। এমনকি নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এখনো জাতীয় পার্টির পক্ষে কোনো ধরনের প্রচার প্রচারণা নেই। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এবার এত সহজে মানুষ জাতীয় পার্টিকে ভোট দেবে না।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ২টি, জাপা ৬টি, বিএনপি ১টি, জামায়াত ১টি, স্বতন্ত্র ১টি ও মুসলিম লীগ-আইডিএল ১টি আসন পেয়েছে।
অন্যদিকে গাইবান্ধা-৫ আসনটি ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনটির দুই তৃতীয় অংশ চর। বর্ষার সময় চারদিকে পানিতে থইথই করে। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে বালু আর বালু। এখানকার লোকজন সারা বছর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকেন। এই আসনে প্রয়াত ফজলে রাব্বী (ভেলু উকিল) দীর্ঘ দিন এলাকার মানুষের পক্ষে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর রাজনীতির শুরু জাতীয় পার্টির রাজনীতি দিয়ে। পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। সেই আসনে এবার জাতীয় পাটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এই আসনে হঠাৎ শামীম হায়দার পাটোয়ারীর আবির্ভাব দেখে ভোটারদের মধ্যে নানান কল্পনা-জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
ভোটারদের দাবি, এই আসনে শামীম হায়দার পাটোয়ারী কী কারণে ভোট পাওয়ার অধিকার রাখে? এখানকার মানুষ তাঁকে চেনে না।
ফুলছড়ি উপজেলার ঝিগাবাড়ির ভোটার কামরুল হাসান বলেন, ‘যে প্রার্থীকে আমরা চিনি না, জানি না, তাকে ক্যানো ভোট দেব? যার বাড়ি এ আসনের মধ্য তাকেই আমরা ভোট দেব। তিনি আমাদের দুঃখ কষ্ট বুঝবেন। এবার উড়ে এসে জুড়ে বসা প্রার্থীকে আমরা ভোট দেব না।’
এবারই ভোটার হয়েছেন শাহনাজ জুটি। তিনি বলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে তরুণেরা দেশের পক্ষের শক্তিকে ভোট দেবে, যারা দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করবেন।’
সাঘাটা উপজেলার হলদিয়ার ভোটার নয়ন মিয়া বলেন, ‘এলাকায় মোটামুটি জাতীয় পার্টির ভোট আছে। তবে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাকে কয়জন চেনে? মানুষ আগের মতো আর নাই যে, মার্কা দেখে ভোট দেবে! মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে। যাকে চেনে না, তাকে ক্যানো মানুষ ভোট দিবে?’
আসনটি ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ৫টি, জাপা ৫টি, বিএনপি ১টি ও স্বতন্ত্র ১টি আসনে জয় পেয়েছে।
শামীম হায়দার পাটোয়ারীর গত নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনটা কঠিন হবে। কারণ এর আগে আওয়ামী লীগই জাতীয় পার্টিকে জেতানোর জন্য মাঠে কাজ করেছিল। আমার জানা মতে, এবার সেই সুযোগ সুবিধা কোনো দলই জাতীয় পার্টিকে দেবে বলে মনে হয় না।’
গাইবান্ধা-৫ আসনে এবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ছেন ফারুক আলম সরকার। আর জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রার্থী হয়েছেন আব্দুল ওয়ারেছ। স্থানীয় ভোটার সবুজ আহম্মেদ বলেন, ‘এবার লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে।’
বর্তমান জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ২০১৮ সালের ২২ মার্চ উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপার মনোনয়নে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি হেরে যান।