Image description

দেশজুড়ে গ্যাস সংকট চরমে। এলপিজি সিলিন্ডার এখন প্রায় দ্বিগুণ দামেও মিলছে না। সরকার বলছে সংকট সাময়িক, মজুত পর্যাপ্ত। বেসরকারি কোম্পানিগুলো বলছে এলসি সংকটের কথা। আমদানিও হয়েছে কম। দাম বাড়ার জন্য আবার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। বাসাবাড়ির লাইনের গ্যাসের অবস্থাও নাজুক। গ্যাস সংকট নিয়ে ইকবাল হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ থাকছে প্রথমটি

মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আসা এলপিজিবাহী কিছু জাহাজে আছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। যার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশে বহনকারী কিছু জাহাজও। সঙ্গে যোগ হয়েছে এলসি (ঋণপত্র) জটিলতা। মূলত এ কারণে দেশের বাজারে সাময়িক এলপিজি সংকট চলছে। আমদানি কমায় সরবরাহ চেইনে তৈরি হয়েছে ঘাটতি। এ সংকটের সুযোগ নিয়ে আগুনে ঘি ঢালছেন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা।

এসব কারণে সরকার বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি। বেশি দাম দিয়েও কোনো কোনো জায়গায় এলপিজির সিলিন্ডারই মিলছে না। এতে চরম সংকটে পড়েছেন ব্যবহারকারীরা। অভিযোগ রয়েছে, সাময়িক এ সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার মুহূর্তে কোটিপতি হয়ে গেছে। তবে বিষয়টি অনেকে জানলেও নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হচ্ছেন না।

ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার পেছনে কমিশনের ব্যর্থতা রয়েছে।

 

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বলছে, এলপিজি বহনকারী জাহাজের সংকট থাকলেও বেসরকারি অপারেটরদের কাছে পর্যাপ্ত এলপিজি মজুত রয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে সংকট কাটাতে প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে।

সরেজমিনে যা পাওয়া গেলো

সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও এলপিজি নিয়ে হাহাকার চলছে। চাহিদামাফিক গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা। আবার খুচরা দোকানিরা খালি সিলিন্ডার নিয়ে বসে আছেন। কাজীর দেউড়ি এলাকার চা দোকানি আলাউদ্দিন বলেন, ‘গত সপ্তাহে ১২ কেজির সিলিন্ডার নিয়েছি ১৮শ টাকায়। রোববার নিয়েছি ২২শ টাকায়।’

 

ব্যাটারি গলি এলাকার চা দোকানি মো. সিরাজ বলেন, ‘আমার দোকানে গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। বাসার সিলিন্ডার নিয়ে এসেছি দোকানে। যার কাছ থেকে গ্যাস নিতাম তাকে ফোন দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে দুই হাজার টাকায়ও গ্যাস মিলছে না।’

বটলিং প্ল্যান্ট যাদের আছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। বটলিং পর্যায়ে কেউ দাম বেশি নিচ্ছে না। কিন্তু সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।-চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক

মোমিন রোড এলাকার দস্তগীর রেস্তোঁরার মালিক মো. আকবর জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত ১৫ দিন ধরে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। আমরা ২২ কেজির সিলিন্ডার নিতাম। এখন ১২ কেজির সিলিন্ডার নিচ্ছি। তাও দ্বিগুণ দামে।’

নগরীর লালখান বাজার এলাকার ইকবাল হোসেন নামে এক ভোক্তা বলেন, ‘মমতা ক্লিনিকের সামনের দোকানটিতে ১২ দিন আগে সকাল ১১টার দিকে নিয়েছি ১৩শ ৫০ টাকা দিয়ে, একই দোকানে মাগরিবের পরে গিয়ে ১৫শ ৫০ টাকায় নিতে হয়েছে। এখন তো আরও অনেক বেশি।’

এলসি জটিলতায় এলপিজি সংকট, ‘ঘি ঢালছেন’ ডিলার-খুচরা বিক্রেতা

লালখান বাজার চাঁনমারি এলাকার বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার রিজেন্সি গ্যাস হাউজের মো. মহসিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কোম্পানি থেকে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না। গ্রাহক থাকলেও বিক্রি করতে পারছি না। খালি সিলিন্ডার নিয়ে বসে আছি।’

হঠাৎ এলপিজি সংকটের কারণ কী?

বর্তমানে এলপিজির সংকটের বেশ কয়েকটি কারণ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক। তিনি এলপিজি ব্যবসায়ও জড়িত। মাহফুজুল হক বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজির সংকট চলছে। আমাদের এলপিজির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বেশি এলপিজি আমদানি হয়। এর মধ্যে যে কয়টি জাহাজ বাংলাদেশে আমদানি করা এলপিজি বহন করতো, সম্প্রতি আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে এলপিজি বহনকারী কয়েকটি জাহাজও পড়েছে।’

এতে সংকট বেশি ঘণীভূত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘এলসি খুললেও জাহাজ সংকটে নির্ধারিত সময়ে এলপিজি আনতে পারেননি আমদানিকারকরা। পাশাপাশি বড় বড় আমদানিকারকরা এলসি জটিলতায় এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। বিশেষ করে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাসের মতো বড় আমদানিকারকরা এলপিজি আমদানি করতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘বটলিং প্ল্যান্ট যাদের আছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। বটলিং পর্যায়ে কেউ দাম বেশি নিচ্ছে না। কিন্তু সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।’

এ ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যের সত্যতা মেলে এলপিজি বিপণনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তার বক্তব্যে। সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল জাগো নিউজকে বলেন, ‘শীতপ্রধান দেশগুলোতে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। আবার শীতকালে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের উৎপাদন কমে যায়। এতে এলপিজির উৎপাদনও কমে। ফলে প্রতি বছর শীত মৌসুমে এলপিজির কিছু সংকট তৈরি হয়। তবে এবারের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন।’

গ্রাহকরা আমাদের কাছে প্রতিনিয়ত বিরক্ত করলেও কিছু করার নাই। কোম্পানি থেকে সরবরাহ না থাকায় আমরা সাধারণ মানুষদের চাহিদা মেটাতে পারছি না।- বিএম এলপি গ্যাসের ডিলার সাজ্জাদ

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অনেক কোম্পানির ব্যাংকিং জটিলতা চলছে। এতে কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। সবমিলিয়ে সবগুলোর কোম্পানির সরবরাহ কমেছে। আগের বছরের চেয়ে গত ডিসেম্বর মাসে প্রায় প্রত্যেক কোম্পানির ২০ শতাংশের মতো সরবরাহ কমেছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডিলার বলেন, ‘বাংলাদেশে বেসরকারি চ্যানেলে কিছু ইরানি গ্যাস আসতো। স্লোগাল এনার্জি নামে একটি কোম্পানি ইরানি গ্যাস সরবরাহ দিতো। নভেম্বরে স্লোগাল এনার্জির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় আমেরিকা। এতে তারা আর এলপিজি সরবরাহ দিতে পারছে না। যার প্রভাবে দেশে সংকট তৈরি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এলপিজি সেক্টরে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এখন দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে কোনো কোনো ডিস্ট্রিবিউটর দুই গাড়ি গ্যাস পেলে এখন এক গাড়ি পেতে তিন-চারদিন লাগছে। আগে গ্যাস সরবরাহ বেশি ছিল, কিন্তু ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা কম নিতো। বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় ডিলাররা তাদের খালি সব সিলিন্ডার ভরে নিতে চাইছেন। এতে চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে।’

এলসি জটিলতায় এলপিজি সংকট, ‘ঘি ঢালছেন’ ডিলার-খুচরা বিক্রেতা

বাকলিয়া এলাকার বেক্সিমকোর ডিলার মো. রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, কোম্পানি থেকে আমাদের কোনো সরবরাহ নেই। ফলে আমরা বিক্রি করতে পারছি না। যখন আমাদের হাতে ছিল তখন ১৩শ ৭০ থেকে ১৪শ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন সরবরাহ নাই তাই বিক্রি করতে পারছি না।’

নিউমার্কেট এলাকার বিএম এলপি গ্যাসের ডিলার সাজ্জাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্রাহকরা আমাদের কাছে প্রতিনিয়ত বিরক্ত করলেও আমাদের কিছু করার নাই। কোম্পানি থেকে সরবরাহ না থাকার ফলে আমরা সাধারণ মানুষদের চাহিদা মেটাতে পারছি না।’

এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ।- লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক

তবে চট্টগ্রাম বিএম এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এলসি করেছি একমাস আগে। এলপি গ্যাসের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বন্দরে না আসায় সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

ডিলাররা অভিযোগ করছেন মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে গ্যাসের সরবরাহ দিচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো সিন্ডিকেট নেই। এমন তথ্য মিথ্যা। আমরা সরবরাহ পেলে গ্রাহকপর্যায়ে সরবরাহ দেবো।’

এলপিজি ব্যবসা কাদের হাতে?

বিপিসি ও এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩৪টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসায় জড়িত। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে। এলপিজি খালাসের জন্য তাদের নিজস্ব টার্মিনাল রয়েছে। অন্যরা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে শুধু বটলিং করে বিপণন করে। দেশের এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলক বড় ১০টি কোম্পানি।

লোয়াবের তথ্য বলছে, ২৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে আমদানির অনুমতি থাকলেও গত ডিসেম্বরে মাত্র ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। বিএম এনার্জি, ওমেরা, ফ্রেশ, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও সান। ব্যাংকিং জটিলতার কারণে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাস, ওরিয়ন, জি-গ্যাস ও নাভানা ঋণপত্র খুলতে পারেনি।

দেশে এলপিজির চাহিদা ও আমদানি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা থাকলেও ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে কম এলপিজি আমদানি হয়েছে। ২০২৪ সালের পুরো বছরে যেখানে ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে এক বছরে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৫ টন। একইভাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের চেয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৮ হাজার ৮৬৬ টন কম আমদানি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৫ টন। আগের বছরের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২ টন।

বিইআরসি নির্ধারিত বাজারদর

চলতি (জানুয়ারি) মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গত মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫) দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। এর আগের মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা।

এলপিজির দাম নির্ধারণ করে রেগুলেটরি কমিশন বলেছে- খুচরা পর্যায়ে কেউ বেশি নিলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের এ বক্তব্যের সুযোগ নিচ্ছে।- ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন

বিইআরসির নতুন দর অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা। ডিসেম্বর মাসে তা ছিল ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। অর্থাৎ, এ মাসে দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা ৪২ পয়সা।

ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গত বছর এলপিজির আমদানি বাড়ানো এবং প্ল্যান্ট সম্প্রসারণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের অনুমতি দেয়নি। অথচ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এলসি করেনি। আমাদের অতিরিক্ত আমদানির অনুমতি দিলে হয়তো এখন ক্রাইসিস (সংকট) তৈরি হতো না।’

এলসি জটিলতায় এলপিজি সংকট, ‘ঘি ঢালছেন’ ডিলার-খুচরা বিক্রেতা

তাছাড়া শীতকালে দেশে এলপিজির চাহিদা বাড়ে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ।’

এর আগে গত অক্টোবর মাসে ইরান থেকে তেল ও এলপিজি আমদানি এবং পরিবহনে সহায়তাকারী ৫০টিরও বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। তবে দেশে সংকটের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে দায়ী করছে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

এমনিতেই শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকান ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার কারণে এলপিজি বহনকারী জাহাজ নিয়েও সংকট চলছে। এ সমস্যাটি সাময়িক। বর্তমানে বাজারে প্রয়োজনীয় এলপিজি রয়েছে।- বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান

ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে অভিযান চালাচ্ছে। এলপিজির ক্ষেত্রে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ব্যর্থতা রয়েছে। এলপিজির দাম নির্ধারণ করে রেগুলেটরি কমিশন বলেছে- খুচরা পর্যায়ে কেউ বেশি নিলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের এ বক্তব্যের সুযোগ নিচ্ছে।’

যা বলছে বিইআরসি ও মন্ত্রণালয়

তবে দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমনিতেই শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকান ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার কারণে এলপিজি বহনকারী জাহাজ নিয়েও সংকট চলছে। এ সমস্যাটি সাময়িক।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে প্রয়োজনীয় এলপিজি রয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে যারা বেশি নিচ্ছেন, সেখানে অভিযান শুরু করা হয়েছে। আশা করছি, এ সংকট দ্রুত কেটে যাবে। তাছাড়া চলতি মাসের চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস আমাদের অপারেটরদের রয়েছে।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জাগো নিউজে বলেন, ‘এলপিজির ৯৮ শতাংশ বেসরকারি খাতে। আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের সবকিছুই বেসরকারি খাতে। সরকারের হাতে আছে মাত্র দুই শতাংশ। সরকারি এলপিজি শুধু ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত হয়। মেনটেন্যান্সের জন্য সেটিও এখন বন্ধ।’

‘এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। কয়েকটা কোম্পানি আমাদের বলেছিল, তাদের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য। আমরা সেই আবেদনগুলো অ্যাপ্রুভ করেছি। আমাদের দিক থেকে যা যা করার সবকিছু করা হয়েছে। এখন বাকিটা পাইকারি বিক্রেতাদের ওপর নির্ভর করবে। কারণ ৯৮ শতাংশ ব্যবসা বেসরকারি খাতে। আমরা লোয়াব, এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে বসেছি।’

সরকার টু সরকারের (জিটুজি) মাধ্যমে এলপিজি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর কথা আমরা চিন্তা করছি। যাতে বেসরকারি খাত একচেটিয়াভাবে বাজার দখল করতে না পারে।- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান

উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন কিছু অতিরিক্ত এলপিজি আমদানি করতে হবে। সেই প্রক্রিয়া এক-দুদিন আগেই শুরু হয়েছে। সপ্তাহখানেক লাগবে অতিরিক্ত এলপিজি আসতে।’

সম্প্রতি এলপিজি আমদানি কম হওয়ার কারণেই সংকট তৈরি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘মনে হয় না। কারণ আমাদের কাছে এলপিজি অপারেটর যে তথ্য দিয়েছেন, গত মাসের তুলনায় এ মাসে এলপিজি আমদানির এলসি বেশি খোলা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি।’

উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমরা ভাবছি সরকার হয়তো এলপিজির আরও বড় অংশে থাকবে। যাতে বাজারে ভারসাম্য থাকে। সরকার আমদানি করার কথা চিন্তা করছে। সরকার টু সরকারের (জিটুজি) মাধ্যমে এলপিজি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর কথা আমরা চিন্তা করছি। যাতে বেসরকারি খাত একচেটিয়াভাবে বাজার দখল করতে না পারে।’