Image description

ভারতে দশকের পর দশক ধরে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে আসছে। জাতিগত নিপীড়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন প্রণয়ন করে মুসলমানদের জমি কিংবা ওয়াকফকৃত সম্পত্তি জবরদখলও অস্বাভাবিক কিছু নয়। মসজিদসহ মুসলমানদের বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস এবং তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদের অসংখ্য নজির রয়েছে।

রাজধানী দিল্লিতে সম্প্রতি তুর্কমান গেটের শতবর্ষী ফাইজ-ই-ইলাহি মসজিদের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদের ঘটনা দেশটিতে বহু বছর ধরে চলা মুসলিম নিপীড়নেরই ধারাবাহিকতা। গত বুধবার কর্তৃপক্ষ সেখানকার হজযাত্রীদের থাকার একটি কক্ষ, একটি বাড়ি, একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সড়কের অংশবিশেষ, ফুটপাত ও একটি কার পার্কিং এলাকা ভেঙে ফেলে। হিন্দুস্তান টাইমস এ খবর প্রকাশ করে।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত সেখানে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের পাশাপাশি অন্তত পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকালে দিল্লি হাইকোর্ট মসজিদ সাইয়েদ ইলাহির পরিচালনা কমিটির করা আবেদনের প্রেক্ষিতে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নোটিস দেয়।

মসজিদ কমিটির আবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি তাদের ব্যবহারে ছিল এবং দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডকে নিয়মিত লিজের ভাড়া দেওয়া হতো। কিন্তু বুধবার রাত ১টার দিকে কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলে সেখানে শতাধিক লোক জড়ো হন। এ সময় পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনার মাত্র ছয় মাস আগেও দক্ষিণ দিল্লির জঙ্গপুরা ও গোবিন্দপুরীতে মুসলিম শ্রমিক শ্রেণির দুটি বসতি ধ্বংস করা হয়। এর মধ্যে একটি ছয় দশকের পুরোনো মাদ্রাসি ক্যাম্প; অন্যটি তিন দশকের পুরোনো ভূমিহীন ক্যাম্প। পুলিশের উপস্থিতিতে চালানো ধ্বংসাত্মক উচ্ছেদ অভিযানে যেন নতুন করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ৫০ বছর আগের ইতিহাস; আবার জাগিয়ে তোলে বুলডোজার দিয়ে পুরান দিল্লির তুর্কমান গেট ধ্বংসের স্মৃতি।

সময়টা ছিল ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাস। ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলমান। নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত এবং দমন-পীড়ন চলছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধী ‘সৌন্দর্যায়ন’ অভিযানের নামে পুরান দিল্লির তুর্কমান গেট এলাকায় বুলডোজার চালান। অগ্রগতির আড়ালে চালানো সেই উচ্ছেদ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম শ্রমজীবী অধ্যুষিত বসতি ধ্বংস করা।

এতে ঘরছাড়া হয় অসংখ্য মুসলিম পরিবার ও বাসিন্দা। শহরটিতে যাদের অনেকেরই শিকড় ছিল মুঘল যুগ থেকে। তারা ধ্বংসাত্মক উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। এতে অনেকের প্রাণহানি হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়নি।

সে ঘটনার প্রায় পাঁচ দশক পর ২০২৫ সালের ১ জুন মুসলিম বসতিতে আবারও চলে বুলডোজার আক্রমণ। সেদিন ভোরে দক্ষিণ দিল্লির জঙ্গপুরার মাদ্রাসি ক্যাম্পে বুলডোজার আর পুলিশের বুটের শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয় মুসলিমদের। যথাযথ উচ্ছেদ নোটিস না দিয়েই চালানো হয় অভিযান। দুপুরের মধ্যেই গৃহহীন হয়ে যান শত শত মানুষ। নারী ও শিশুদের ভাঙা ঘরের ধ্বংসস্তূপের পাশে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

পরদিন গোবিন্দপুরীর কাছে ভূমিহীন ক্যাম্পে পৌঁছায় উচ্ছেদকারী দল। সেখানে থাকতেন দিনমজুর, অভিবাসী শ্রমিক, গৃহকর্মী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। দিল্লি হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চে উচ্ছেদ স্থগিতের আবেদন শুনানির কয়েক মিনিট আগে ভেঙে ফেলা হয় দুই আবেদনকারীর ঘর। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় পুরো বসতি। এখানেও অপর্যাপ্ত নোটিসে পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই আদালতের নির্দেশ অমান্য করেই চালানো হয় অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান।

ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, দলিত বস্তি ও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ২০২৪ সালে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকার লখ্নৌর আকবরনগরে ৫০ বছরের পুরোনো মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় এক হাজার ৮০০-এর বেশি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। এতে অন্তত ১০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়।

২০২২ সালের জুনে প্রয়াগরাজে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় আফরিন ফাতিমার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। ফাতিমার বাবাকে গ্রেপ্তারের কদিনের মধ্যে তার বাড়ি উচ্ছেদ করা মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন।