ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৩২ দিন। এ নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে নানান সংশয়-শঙ্কা কাজ করলেও তফসিল ঘোষণার পর তা কেটে গেছে। সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে; রাজনৈতিক দলগুলোও পুরোদমে নির্বাচনি কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দলগুলোর নেতারা নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও অপপ্রচারকারীরা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। সংঘবদ্ধ গ্রুপটি পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে।
তারা ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশে এবং বিদেশে বসে এসব অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল ও অনলাইন টকশোর মাধ্যমে একতরফা ও ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। চক্রটি সংঘবদ্ধ হয়ে নির্বাচন ভন্ডুল করতে চায়। এতে সাধারণ ভোটার ও জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ বাড়ছে। এই বিভ্রান্তিকারীদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছেন। অপপ্রচার শনাক্ত ও প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচনের বিষয়ে যারা এখনো সন্দেহ ও সংশয় ছড়াচ্ছেন, তাদের সরকার নজরদারিতে রেখেছে। যারা এখনো সংশয় তৈরি করছে, তাদের প্রোফাইল সরকার স্পষ্টভাবে জানে। তারা আগে কী ছিল, তাদের ভূমিকা কী ছিল? তারা কেন সংশয় ছড়াচ্ছেন? অপপ্রচার শনাক্তে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া পোস্টার, বিকৃত ভিডিও ও মনগড়া বক্তব্য ছড়িয়ে নির্বাচনপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সে কারণে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারে।
আবার কিছু কিছু দলের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হচ্ছে প্রশাসন একটি দলের পক্ষ নিয়েছে। রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এমন বক্তব্য জনমনে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ বাড়াচ্ছে।
বুধবার নির্বাচন কমিশনে যায় জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদল। নেতৃত্ব দেন দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় “দলীয় ডিসি” নিয়োগ করা হয়েছে। এ ধরনের ডিসি-এসপি (জেলা প্রশাসক-পুলিশ সুপার) যারা আছেন তাদের অপসারণ করতে হবে এবং নিরপেক্ষ ডিসি-এসপিকে সেখানে নিয়োগ করতে হবে। না হলে নির্বাচন “প্রশ্নবিদ্ধ” হবে।’ মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনে যায় এনসিপির প্রতিনিধিদল। নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব দেখা গেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, নাকি বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো প্রশাসনের একতরফা আচরণ, রাতের ভোট এ ধরনের একটি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে হয়ে যাবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’ রাজনৈতিক দলগুলোর এমন নানান অভিযোগ কেন্দ্র করেও সমাজমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এদিকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই এবং জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত একটি গোষ্ঠী অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই এবং নির্বাচনই একমাত্র পথ। বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।’ এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অপপ্রচার শনাক্তে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভোটারদের যেকোনো তথ্য যাচাই করে গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল ছয় মাস আগেও ভেবেছিল তারা ক্ষমতায় এসে গেছে। যাদের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই সেই দল এখন বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে কথা বলছে। আমি স্পষ্টভাবে বলছি, কোনো অপপ্রচারই কাজে আসবে না। যারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবে, দেশবাসী তাদের চিহ্নিত করবে।’
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে কোনো অনিশ্চয়তা দেখছি না। আশা করি যথাসময়ে নির্বাচন হবে এবং হতেই হবে। তবে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী চাচ্ছে যেন নির্বাচন না হয়। তারা নানান ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে চব্বিশের বিপ্লবের পর জনগণ চাচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসুক। আমরাও সেটাই চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন ঘিরে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি। প্রশাসনসহ সরকার এখন একদিকে ঝুঁকে গেছে। প্রশাসনে যে লোকগুলো রয়েছেন তারা ঠুনকো অজুহাতে আমাদের মনোনয়নপত্রগুলো বাতিল করে দিয়েছেন। তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছেন না। এ ছাড়া নেতাদের ভয়ভীতি, হুমকিধমকি, লাশ ফেলার হুমকিও নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছেন।’