রাজধানীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৪০১ অবৈধ অস্ত্রধারী। তাদের কাছে রয়েছে ২ সহস্রাধিক অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া খুন, চাঁদাবাজি, দখলসহ ভয়ংকর সব অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে এসব অস্ত্র। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ভর করেছে জনমনে। আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সর্বত্র। সম্প্রতি একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন ভয়ংকর সব তথ্য। অন্যদিকে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্রের কোনো হদিস নেই এখনো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীদের হাতে থাকা বেশির ভাগ অস্ত্রই ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়েই রয়েছে এসব অস্ত্রধারীরা। ফলে এদের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশও হুমকিতে পড়তে পারে। স্বীকার না করলেও এতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস্) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শহীদ ওসমান হাদির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার, ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারসহ ঘটনার নেপথ্য উন্মোচনে র্যাব অনেক প্রশংসা পেয়েছে। অবৈধ অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে র্যাবের প্রতিটি সদস্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে মাঠে রয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করে বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেশিবিদেশি চক্র সক্রিয় রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাব সদস্যরা সাধ্যের কমতি রাখছেন না।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) ড. মো. আশরাফুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের স্পেশাল ড্রাইভ চলমান রয়েছে। মাঠপর্যায়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ আরও জোরদারের নির্দেশনা হয়েছে। সম্প্রতি সময়ে অস্ত্র আইনে যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলোর তদন্তে আরও গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, ঢাকায় অস্ত্রের ঝনঝনানি কমাতে সম্প্রতি ৪০১ জন অবৈধ অস্ত্রধারীর তালিকা করেছে একটি সংস্থা। যাদের সবার বিরুদ্ধেই অস্ত্র আইনে এক বা একাধিক মামলা রয়েছে, তারা সবাই এ তালিকায় রয়েছে। তবে এসব অস্ত্রধারীর কেউ কেউ দেশের বাইরে ও কারাগারে থাকলেও বাকিরা নির্বাচনি মাঠে হুমকির কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী ঢাকায় অবৈধ অস্ত্রধারী সবচেয়ে বেশি মতিঝিল বিভাগে। এই বিভাগে ১১৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী রয়েছে। এ ছাড়াও রমনা বিভাগে ৩৬, লালবাগে ২৪, ওয়ারীতে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০, উত্তরায় ১৩ ও গুলশান বিভাগে ১৬ জন অবৈধ অস্ত্রধারী রয়েছে। এসব তালিকাভুক্ত অবৈধ অস্ত্রধারী ও তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারের আরেকটি সংস্থা সারা দেশের ৭৫৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রধারীর সংখ্যা ৪৭২ জন। এই তালিকা নিয়ে সরকারের কয়েকটি সংস্থা অভিযান পরিচালনা করছে। তবে তালিকার বড় একটি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং তাদের ঘনিষ্ঠজন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীদের পরিচয় বিবেচনা করে অভিযান পরিচালনা করলে সমাজ কখনো স্থিতিশীল হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন দাগি আসামি জামিনে মুক্তি পাওয়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। বাস্তবে হয়েছেও তাই। এজন্য ২০২৫ সালে অস্ত্র আইনে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর সারা দেশে অস্ত্র আইনে ১ হাজার ৮১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে রাজধানীর ৫০ থানায়ই ২৩২টি অস্ত্র মামলা হয়েছে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯৭ শতাংশ বেশি। এদিকে সারা দেশে গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অপারেশনে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি অবৈধ অস্ত্র।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে আমরা সব সময় কঠোর অবস্থানে আছি। সামনের দিনগুলোতেও কঠোর অবস্থা বলবৎ থাকবে। এ ক্ষেত্রে নজরদারি কমানোর কোনো সুযোগ নেই। যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
?লুটের ১৫ শতাংশ অস্ত্রের হদিস নেই : জুলাই-আগস্টে দেশের ৪০০-এর বেশি থানা ও কারাগার থেকে ৫ হাজার ৮১৮টি অস্ত্র লুট হয়। যার ৮৫ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। তবে পুলিশের ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র গোলাবারুদের ৩০ শতাংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। গণভবন এলাকা থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি অস্ত্রও খোয়া যায়। অপারেশন ডেভিল হান্টের পর ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র-গুলি বেহাত রয়ে গেছে। এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলমও। তিনি বলেছেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়াটা উদ্বেগের। তিনি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ নির্দেশনা দেন।
এদিকে কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গণ অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগার থেকে ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে যান। পরে তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫১৯ জনকে ফেরানো সম্ভব হলেও এখনো ফেরার ৭১৩ জন। এ সময় দেশের কারাগারগুলো থেকে ৬৭টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ২৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। বিষয়টি গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় স্বীকার করেছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। একই অনুষ্ঠানে আইজিপি বাহারুল আলমও স্বীকার করেছেন বিষয়টি উদ্বেগের। তিনি আরও বলেন, এগুলো ব্যবহারের কিছু আশঙ্কা রয়েছে। তবে লুট হওয়া ভারী অস্ত্র এখনো ব্যবহার হয়নি। ছোট ছোট কিছু অস্ত্র ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। অস্ত্র উদ্ধারে কেউ কেউ তথ্য দিচ্ছেন, সেই অনুযায়ী উদ্ধার করা হচ্ছে।