
স্বার্থের দ্বন্দ্বে মাঠের আন্দোলনে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী এবং বিএসসি প্রকৌশলীরা। দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে দশম গ্রেড। একপক্ষের দাবি ৩টি হচ্ছে-৩৩ শতাংশ পদোন্নতি কোটা অযৌক্তিক, টেকনিক্যাল গ্রেড উচ্চতর যোগ্য প্রার্থীর জন্য উন্মুক্তকরণ এবং বিএসসি ছাড়া কেউ ইঞ্জিনিয়ার পদবি ব্যবহার করতে পারবে না। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বেতন গ্রেডের বৈষম্য নিরসন করতে হবে। অপর পক্ষ সাত দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। তাদের মতে, মীমাংসিত বিষয় নিয়ে মাঠ গরমের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া হবে না। এই ইস্যুতে নিজেদের দাবি আদায়ে অনড় অবস্থানে উভয় পক্ষ। ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে-আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি। বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের অভিযোগ-‘আন্দোলন ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ১১ ও ১২তম গ্রেডের নিয়োগগুলো বন্ধ করে রেখে দশম গ্রেডে নিয়োগ বাগিয়ে নিচ্ছেন ডিপ্লোমাধারীরা। রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণে পদোন্নতি নিয়ে অনেকে প্রবেশ করছেন নবম গ্রেডে, যা বিএসসি প্রকৌশলীদের সঙ্গে বড় ধরনের বৈষম্য। অন্যদিকে ডিপ্লোমাধারীরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের গ্রেডিং একটি মীমাংসিত বিষয়। কিন্তু তারা নিজেদের মর্যাদা নষ্ট করে দশম গ্রেডে আসতে চাচ্ছেন। তাদের এসব দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তি। ১৯৭৮ ও ১৯৯৪ সালের সরকারি নীতিমালায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের এসএইই (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) হিসাবে নিয়োগযোগ্য হিসাবে ধরা হবে। কোটাব্যবস্থা এবং পদোন্নতির অনিয়মই মূলত এই বিরোধের জন্ম দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
দশম গ্রেড নিয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে রেষারেষি দীর্ঘদিনের। এমন অবস্থার মধ্যেই তিন দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার কোর্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। মূলত এ আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ বুধবার তারা প্রধান উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় বাসভবন ‘যমুনা’র দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ। দুপক্ষের সংঘর্ষে কার্যত রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। নিক্ষেপ করা হয় টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড। বুধবার রাতে দুই উপদেষ্টা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু তা ফলপ্রসূ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বৃহস্পতিবার দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করে। বৃহস্পতিবারও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপদেষ্টাদের বৈঠক হয়। কিন্তু এদিনও সভার পর শিক্ষার্থীরা তাদের শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
বিএসসি তথা প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দাবি-ডিপ্লোমাধারীদের পদগুলা ছিল তৃতীয় শ্রেণির। এখান থেকে উত্তরণের জন্য তারা ১৯৯০, ৯১ ও ৯২ সালে আন্দোলন করেও সফল হননি। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০১৩ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে ১০, ১১ ও ১২তম গ্রেড নিজেদের জন্য নির্ধারণ করে নেন ডিপ্লোমাধারীরা।
বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা জানান, আন্দোলন ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ১১ ও ১২তম গ্রেডের নিয়োগগুলো কৌশলে দীর্ঘদিন বন্ধ রেখেছেন ডিপ্লোমাধারীরা। মূলত ১১ থেকে ১২তম গ্রেড বন্ধ রেখে দশম গ্রেডে নিয়োগ বাগিয়ে নিচ্ছেন তারা। অনেকে পদোন্নতি পেয়ে ঢুকে পড়ছেন নবম গ্রেডে। অথচ তাদের নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫তম গ্রেডে। এতে চাকরি ও পদোন্নতিতে বঞ্চিত হচ্ছেন বিএসসি প্রকৌশলীর শিক্ষার্থীরা। যোগ্যতা থাকার পরও অনেকে চাকরি পাচ্ছেন না। এটা বড় ধরনের বৈষম্য। এ বৈষম্য দূর না হলে বিএসসি প্রকৌশলীরা আগামী দিনে সরকারি চাকরির বাজারে আরও পিছিয়ে যাবেন।
তারা মনে করেন, ডিপ্লোমাধারীরা নিম্ন গ্রেড থেকে শুরু করে আন্দোলনের মাধ্যমে উচ্চ গ্রেডের পদগুলো দখল করেছেন। ফলে বিএসসি প্রকৌশলীদের জন্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মেধাবী বিএসসি প্রকৌশলীদের ন্যায়সংগত কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বুয়েটের অধ্যাপক ও আইইবির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা সাব্বির যুগান্তরকে বলেন, আমরা শুধু আমাদের অধিকার দাবি করেছি। যে কোটা সুবিধা ডিপ্লোমাধারীদের দেওয়া হয়, সেই কোটা বাতিল চেয়েছি। কারণ, আমরা চাই সবাই নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আসুক। তিনি বলেন, তারাও নিজেদের দাবি উপস্থাপন করেছেন। আমরা আমাদের দাবি উপস্থাপন করেছি। বিষয়টি সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। ইতোমধ্যে সরকার কমিটিও গঠন করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, বিষয়টি সরকার সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান করবে।
প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ডিপ্লোমাধারীদের চেয়ে বিএসসি প্রকৌশলীদের সংখ্যা অনেক কম। তবুও প্রয়োজনের তুলনায় বিএসসি প্রকৌশলীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ডিপ্লোমাধারীরা অধিকাংশ জায়গায় সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, দেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়য়ারদের প্রয়োজন অনেক। তাদের যদি ১৩ থেকে ১২তম গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হতো এবং ধাপে ধাপে তাদের প্রমোশন হতো, তাহলে কোনো সমস্যা তৈরি হতো না। কিন্তু বাস্তবে এটি হচ্ছে না। তাদের ১০ম গ্রেডে ঢুকানো হচ্ছে এবং প্রমোশন দিয়ে নবম গ্রেডে প্রবেশ করানো হচ্ছে। ফলে বিএসসি প্রকৌশলীদের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে।
প্রকৌশলী অধিকার পরিষদের উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান শহিদ বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন্স ফ্রেমওয়ার্কের (বিএনকিউএফ) মাধ্যমে শিক্ষাগত যোগ্যতার মান নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সারা বিশ্বে একই পদ্ধতি। ডিপ্লোমাধারীরা চাকরির অভিজ্ঞতা দিয়ে বিএসসির যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন না। অর্থাৎ শুধু অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লেভেল ৬ (ডিপ্লোমা) থেকে লেভেল ৭-এ (বিএসসি, যা নবম গ্রেডের জন্য বাধ্যতামূলক) যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও কারিগরি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের প্রধান বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. মাসফিক ইসলাম দেওয়ান যুগান্তরকে বলেন, দেশে ৫১টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে এবং আরও ২৩টি নির্মাণাধীন। এছাড়া চারটি বিভাগীয় শহরে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করা হচ্ছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন আরও চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মাণাধীন। ৬০০-এর অধিক বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় ডুয়েট নামে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সরকার কারিগরি সেবার প্রসার আরও বাড়াতে শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিচ্ছে। কারণ, পলিটেকনিক একটি বিশেষায়িত শিক্ষা এবং ব্যবহারিক কাজ বেশি। তাদের দশম গ্রেডে অর্থাৎ উপসহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা কারিগরিতে পড়ে দশম গ্রেডে চাকরি পাওয়ার জন্য। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের দশম গ্রেডে আবেদনের সুযোগ দিলে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে না। নবম এবং দশম গ্রেড উভয় পদে আবেদনের সুযোগ পেতে এসএসির পর এইচএসসি সম্পন্ন করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাইবে। এতে সরকারি-বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রাইভেট সেক্টর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ফেডারেশন, বাংলাদেশ-এর সমন্বয়ক প্রকৌশলী মো. আবেদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯৪ সালের সরকারি নীতিমালায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের এসএইই (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) হিসাবে নিয়োগযোগ্য হিসাবে ধরা হবে। কিন্তু অনেকেই সে সম্মানটুকু দিতে রাজি নয়। মতপ্রকাশ গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু সেটি যদি হয় অসম্মানজনক ও তথ্যহীন, তাহলে তা বিভাজন তৈরি করবে, সমাধান নয়।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিইএবি), ইলেকট্রো-মেডিকেল কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক শরীফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ডিপ্লোমাধারী এবং বিএসসি বা গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী সবাই সরকার স্বীকৃত প্রকৌশলী। এ পর্যায়ে বিএসসি প্রকৌশলীদের সম্পূর্ণ অযৌক্তিক দাবি-শুধু তারাই নামের আগে ইঞ্জিনিয়ার লিখতে পারবে। এই চিন্তাধারা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের হতে পারে না।
ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) অন্তর্বর্তীকালীন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী কাজী সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিএএসসি ইঞ্জিনিয়াররা নবম গ্রেডে এবং ডিপ্লোমাধারীরা দশম গ্রেডে। কিন্তু তারা এখন নিজেদের মর্যাদা নষ্ট করে দশম গ্রেডে আসতে চাচ্ছেন। একটি মীমাংসিত বিষয়কে অশান্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন।