
গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ নামে একটি নতুন আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খসড়াটি নিয়ে আরো যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা চিলাহাটি, দৌলতগঞ্জ ও তেগামুখ স্থলবন্দর বন্ধ এবং বাল্লা স্থলবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ১৭ অক্টোবর বাউল সাধক ফকির লালন শাহর তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ উপস্থিত ছিলেন।
প্রেস সচিব বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) উপদেষ্টা পরিষদে গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি উত্থাপনের পর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এর ওপর আরো আলোচনা হবে। আলোচনা শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্স ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সে বাংলাদেশ গত বছরের ২৯ আগস্ট অংশীদার হয়। কনভেনশনের আলোকে এবং সংবিধানে সংরক্ষিত জীবন ও ব্যক্তির স্বাধীনতার অধিকার কার্যকর করার উদ্দেশ্যে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশটির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
শফিকুল আলম জানান, এ বিষয়ে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের মতামত ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস বা ব্লাস্ট ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় আয়োজিত দুটি মতবিনিময় সভা থেকে পাওয়া পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে খসড়াটি পরিমার্জন করা হয়। অধ্যাদেশে গুমকে সজ্ঞায়ন ও শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গোপন আটক কেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুম-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
শফিকুল আলম জানান, খসড়া অধ্যাদেশে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা-সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। ভুক্তভোগী, তথ্য প্রচারকারী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণের বিধান রাখা হয়েছে। গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষার জন্য তহবিল গঠন এবং তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আমার দেশকে বলেন, গুমের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বদ্ধপরিকর। আমাদের সরকার গত বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় (২৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম কনভেনশনে স্বাক্ষর করে এর অংশীদার হয়েছে। বিগত আমলে গুমের যত ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে তদন্তের জন্য আমরা সরকার গঠনের পরপরই গুম ইনকোয়ারি কমিশন গঠন করেছি। ওই কমিশন ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজার গুমের অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে, আগামী ডিসেম্বরে তারা কাজ শেষ করবে।
গুম কমিশন এবং ব্লাস্টসহ কয়েকটি সংগঠন ও সংস্থা গুমের বিচারে আইন প্রণয়নসহ কিছু সুপারিশ করেছে। আইন মন্ত্রণালয়ও সেমিনারের মাধ্যমে মতামত নিয়েছে। সরকার নতুন আইনের বিষয়ে কী উদ্যোগ নিয়েছেÑএমন প্রশ্নের জবাবে আইনের শিক্ষক আসিফ নজরুল জানান, গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তার বিচারের জন্য আমরা আইন মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছি। এই খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে গুম ইনকোয়ারি কমিশন, ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং গুরুত্বের সঙ্গে তাদের মতামত আইনে প্রতিফলন করা হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, এ আইনে গুমের অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে; গুমের বিচার নিশ্চিত করার জন্য পৃথক তদন্ত দল, পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে; গুমের ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণসহ পৃথক তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে গুম হওয়া ব্যক্তির নির্ভরশীল সদস্যরা যেন ভরণ-পোষণ পেতে পারেন, তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার বিধান করা হয়েছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই আইনটি কার্যকর করে গুমের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
প্রস্তাবিত আইনে শেখ হাসিনার আমলে আয়নাঘরসহ বিভিন্নভাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিচার পাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ থাকছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘যে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে এই আইনটি তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। চলমান অপরাধ হওয়ার ফলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত গুম অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে এই আইন কার্যকর হওয়ার আগে যত গুমের ঘটনা ঘটেছে, সব ঘটনার বিচার এ আইনের অধীনে করা সম্ভব হবে। বিগত আমলে যারা আয়নাঘরসহ নানাভাবে গুমের শিকার হয়েছেন, তাদের সবাই এ আইনের আওতায় বিচার পাবেন।’
ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব বলেন, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এ দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করবে।
তিন স্থলবন্দর বন্ধ ও একটির কার্যক্রম স্থগিত
দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা চিলাহাটি, দৌলতগঞ্জ ও তেগামুখ স্থলবন্দর সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা এবং বাল্লা স্থলবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে। এ তথ্য জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় সীমান্ত এলাকায় কয়েকটি স্থলবন্দর অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি। ফলে এগুলো সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে কার্যক্রমহীন আরো চারটি স্থলবন্দরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লালন শাহর তিরোধান দিবস ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ১৭ অক্টোবর বাউল সাধক ফকির লালন শাহর তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যেমনÑকথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান এবং রক সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রেস সচিব বলেন, জাতীয়ভাবে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে লালনচর্চা এবং গবেষণা নতুন মাত্রা পাবে বলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আশা করছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করবে। লালন আমাদের গ্লোবাল কালচারাল হেরিটেজের অন্যতম সম্পদ।
উল্লেখ্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।