Image description

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলকে পরাজিত করে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে তারা। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিবিসির হিসাবে, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৫২টি এবং রিপাবলিকানদের ৪০টি। এ সময় পর্যন্ত সিনেটের ৩৫টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে ২৭টির ফল এসেছে। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ৩০০টির ফল পাওয়া গেছে। সেখানে ডেমোক্র্যাটরা ১৯০টি এবং রিপাবলিকানরা ১১০টি আসনে এগিয়ে বা জয়ী হয়েছেন। বিবিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসন পেয়ে হাউসের নিয়ন্ত্রণ নেবে।

বিজ্ঞাপন

 

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের বড় প্রত্যাবর্তন

 

যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ সদস্যের সিনেটে এবার নির্বাচন হয়েছে ৩৫টি আসনে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং দুটি বিশেষ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ৫৩টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোটবদ্ধ দুই স্বতন্ত্র সিনেটরসহ দলটির আসন ছিল ৪৭টি। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ৫১টি আসন প্রয়োজন।

 

সিবিএস নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় চারটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাস, ওহাইও ও নর্থ ক্যারোলাইনায় দলটির গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এসেছে। এ ছাড়া আইওয়াতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জশ টুরেক। জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে নিজেদের আসন ধরে রাখতে পেরেছে দলটি।

 

টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। কানসাসে সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন। ওহাইওতে শেরড ব্রাউন এবং নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপারও গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছেন।

 

আইওয়ায় রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট জশ টুরেক। অঙ্গরাজ্যটিতে ২০০৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। জর্জিয়ায় রিপাবলিকান মাইক কলিন্সকে হারিয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জন অসফ। নিউ হ্যাম্পশায়ারে জন সুনুনুকে পরাজিত করেছেন ক্রিস পাপাস।

 

সিনেটের এই পালাবদল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রশাসনের বিচার বিভাগ ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন অনুমোদন করানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।

 

প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের

 

কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনেই এবার নির্বাচন হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কক্ষটি। কিন্তু এবার একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে জয় পেয়ে নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা।

 

বিবিসির লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, ভোট গণনার একপর্যায়ে ৩০০টি আসনের ফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ১৯০টি এবং রিপাবলিকানরা ১১০টি আসনে জয়ী বা এগিয়ে ছিলেন। তবে সিবিএস নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা শেষ পর্যন্ত অন্তত ২১৮টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে।

 

নর্থ ক্যারোলাইনায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। পেনসিলভানিয়া, কেনটাকি, কলোরাডো, মিসৌরি, আইওয়া, ভার্জিনিয়া ও ওহাইওতেও দলটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছে। মিসৌরির দ্বিতীয় কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান অ্যান ওয়াগনারকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট ফ্রেড ওয়েলম্যান। ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান জেন কিগানসকে পরাজিত করে কংগ্রেসে ফিরেছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এলেইন লুরিয়া।

 

ডেমোক্র্যাটরা হাউসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় স্পিকার পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। দলটির নেতা হাকিম জেফরিস স্পিকার নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

 

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথম দুই বছর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। কিন্তু এখন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই জায়গাতেই ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও নীতির ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে।

 

বিশেষ করে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। বাজেট ও নতুন আইন পাসের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।

 

নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় এই নির্বাচনে দলটির প্রত্যাশার চেয়েও বড় সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন না; থাকলে রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে জিতত। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর আগামী দুই বছর তার প্রশাসনকে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত বিরোধিতার মুখে কাজ করতে হবে।

 

তথ্যসূত্র: বিবিসির লাইভ নির্বাচনি আপডেট, সিবিএস নিউজ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস