খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য বাংলাদেশি দূতাবাসের সহযোগিতা নেবে সংস্থাটি। দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রমাণিত হলে চাকরি হারাতে হবে অভিযুক্ত শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারকে বলে জানা গেছে।
এর আগে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়ে দীপন চন্দ্র সরকারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় মাউশি। শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় তাকে আবারও শোকজ করা হবে বলে জানা গেছে। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি প্রস্তুতও করা হয়েছে। চিঠির জবাব দিতে দীপক চন্দ্রকে সাত কর্মদিবসের দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে প্রধান শিক্ষকের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা হবে। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।’
প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের প্রণোদনা অনুদানের ৭৪ হাজার ৪৮০ টাকার কাজের মান সন্তোষজনক নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রধান শিক্ষকের ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করে মাউশিতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের প্রণোদনা অনুদানের ৭৪ হাজার ৪৮০ টাকার কাজের মান সন্তোষজনক নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৫ এপ্রিল প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারকে শোকজ করে মাউশি। ১০ কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জবাব দিতে বলা হয়েছিল। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জবাব দাখিল করেন। পরে ৭ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হওয়ায় পুনরায় তাকে শোকজের চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
এর আগে দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালে বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এ নিয়োগে অন্তত ৩০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও ওঠে।
এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকা প্রণোদনা অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা শিক্ষক, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বাকি ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটা ও ভবন মেরামতের কাজে ব্যয়ের কথা বলা হলেও তদন্তে কাজের মান এবং বিল-ভাউচারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক তার পরিবারের সদস্যদের ভারতে রেখে বাংলাদেশে বিদ্যালয়ের পদ ব্যবহার করে সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এমনকি অর্থ ভারতে পাচারের অভিযোগও করেছেন তারা।
জানা গেছে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরবর্তী সময়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমানও বিষয়টি তদন্ত করেন।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে পাইকগাছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী জানান, ভারতের ভোটার তালিকায় নাম থাকায় প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতীয় নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া আবশ্যক উল্লেখ করেন।
পরবর্তী সময়ে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা মাউশির মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বিষয়টিকে গুরুতর ও স্পর্শকাতর উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অবহিত করেন।
তবে দীপক চন্দ্র সরকার তার বিরুদ্ধে আনা দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি ভারতের ভোটার নন, বাংলাদেশের নাগরিক। বিদ্যালয়ের অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।’