Image description

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কোরআন হাতে শপথ নিয়েছেন এক মুসলিম নারী। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তার সেই সাংবিধানিক অধিকারকেই এবার আর্জেন্টিনার ভূখণ্ড দাবির যুক্তি বানালেন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। তার দাবি, ব্রিটেন নাকি ‘ইসলামের উপনিবেশ’ হয়ে যাচ্ছে। বিতর্কিত মন্তব্যটি আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন মিলেই নিজেও। এক নারী সাংসদের শপথ থেকে দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ, অদ্ভুত এই যোগসূত্রে নতুন উত্তেজনা।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা সান্তিয়াগো কাপুতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটেন সম্পর্কে এসব মন্তব্য করেছেন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দেওয়া পোস্টে তিনি বলেছেন, একসময় আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম জন্মভূমি ছিল যুক্তরাজ্য। এখন ইসলাম দেশটিকে ‘উপনিবেশে পরিণত করছে’। তাঁর ভাষায়, এটি গোটা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য ‘আসন্ন বিপদ’।

কাপুতোর পোস্টে ছিল ব্রিটিশ লেবার পার্টির নবনির্বাচিত সাংসদ সাগাল আবদি-ওয়ালির শপথের ছবি। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই নারী শৈশবে শরণার্থী হিসেবে ব্রিটেনে আসেন। গত সপ্তাহে লন্ডনের হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস আসনের উপনির্বাচনে গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিকে হারিয়েছেন তিনি। আসনটির আগের সাংসদ ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে কোরআন হাতে শপথ নেন আবদি-ওয়ালি।

স্পেনের ডানপন্থী ভাষ্যকার হাভিয়ের নেগরে ওই শপথের ছবি ছড়িয়ে ব্রিটেনে ইসলাম শক্তিশালী হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। তার পোস্টকে সামনে এনে কাপুতো দাবি করেছেন, দক্ষিণ আটলান্টিকে কোনো ‘ইসলামী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ’ ঠেকাতে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তিনি এটিকে শুধু জাতীয় দাবি নয়, ‘পশ্চিমের স্বার্থ’ বলেও উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট মিলেই সেই বক্তব্য নিজের পাতায় পুনঃপ্রকাশ করেছেন।

অথচ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়মেই সাংসদেরা নিজ ধর্মগ্রন্থে শপথ নিতে পারেন। ধর্মীয় শপথের বদলে ধর্মনিরপেক্ষ অঙ্গীকারের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে কোরআন হাতে শপথ নেওয়া আইনসম্মত সংসদীয় প্রক্রিয়া। এটি ব্রিটেনের ওপর অন্য কোনো রাষ্ট্র বা ধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রমাণ নয়।

মিলেইর নিজের ইসরায়েলপন্থী অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। গত ৯ মার্চ নিউইয়র্কের ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইহুদিবাদী প্রেসিডেন্ট হতে পেরে আমি গর্বিত।’ ১০ মার্চ বুয়েনস এইরেস হেরাল্ড ও এল পাইস তার ওই বক্তব্য প্রকাশ করে। একই অনুষ্ঠানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্জেন্টিনার কৌশলগত সম্পর্কের কথাও বলেছিলেন তিনি।

আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম লা নাসিওন জানিয়েছে, মিলেই সম্প্রতি ইসলামকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা আরেক প্রচারকের পোস্টকেও সমর্থন দিয়েছেন। ওই প্রচারকের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ দায়ের করেছে আর্জেন্টিনার ইসলামিক সেন্টার। তবে উপদেষ্টার সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে আবদি-ওয়ালির কোনো প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফকল্যান্ডকে আর্জেন্টিনা বলে মালভিনাস। ১৯৮২ সালে দ্বীপপুঞ্জটি নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যায় বুয়েনস আইরেস। চুয়াত্তর দিনের ওই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনা নিহত হয়েছিলেন। সেই সময় প্রাণ হারান দ্বীপপুঞ্জের তিন বেসামরিক বাসিন্দাও। বর্তমানে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকা দ্বীপগুলোর প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ২০১৩ সালের গণভোটে ব্রিটেনের অধীনে থাকার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এরপরও আর্জেন্টিনা সেই ফলকে সার্বভৌমত্ব বিরোধের নিষ্পত্তি মানে না।

সম্প্রতি দ্বীপপুঞ্জের তেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে আর্জেন্টিনা। ব্রিটেন পাল্টা আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার কাছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের আবেদন জানিয়েছে।

একদিন শরণার্থী হয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নিয়েছিলেন সাগাল আবদি-ওয়ালি। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজ তিনি দেশটির নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কোরআন হাতে তাঁর শপথ সেই যাত্রারই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অথচ সেই দৃশ্যকেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবির যুক্তি বানানোর চেষ্টা হয়েছে। ফকল্যান্ড নিয়ে লন্ডন ও বুয়েনস আইরেসের বিরোধ বহু পুরোনো। কিন্তু এবার সেই বিরোধ জন্ম দিয়েছে নতুন প্রশ্নের। একজন মুসলিম নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার ও ধর্মীয় পরিচয় কেন দুই দেশের ভূখণ্ডবিরোধের নিশানা হবে?