যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির প্রতি সমর্থন হারাচ্ছেন দেশটির তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ। অর্থনৈতিক সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড়, যুদ্ধ এবং নারীদের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অসন্তোষ থেকে তাদের অনেকে এখন ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছেন। কেউ কেউ আবার আসন্ন নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী এখন নিজেদের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসে তার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনমত জরিপের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী পুরুষ ভোটারদের ৫৫ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। তরুণদের মধ্যে রিপাবলিকানদের এই সাফল্য ছিল আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। তবে সাম্প্রতিক চিত্রে সেই সমর্থনে ভাটা পড়েছে। বর্তমানে তরুণ পুরুষ ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা এক শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এদিকে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন করা তরুণীদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন ৩১ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
আইওয়ার ডেস মইনসের ২৬ বছর বয়সী বিক্রয় প্রতিনিধি মাইকেল জনসন ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এখন তার অবস্থান পাল্টেছে। জ্বালানি ও আবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
লাইবেরিয়ায় জন্ম নেওয়া জনসন ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। নির্বাচনের আগে নারীদের খেলাধুলায় পুরুষদের অংশগ্রহণ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান তাকে ট্রাম্পের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। এমনকি পরিবারের ১৫ জন সদস্যকেও ট্রাম্পকে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছিলেন তিনি।
কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে দিনের বেলায় কাজ করার পাশাপাশি রাতে হোল ফুডসে কাজ করছেন জনসন। তার সাতজন বন্ধুকেও বাড়তি আয়ের জন্য দ্বিতীয় চাকরি নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে তার মায়ের আফ্রিকান পণ্যের দোকানের ভাড়া বাড়ছে এবং জ্বালানির মূল্যও চাপ তৈরি করছে। জনসনের ভাষায়, আমি আর রিপাবলিকানদের ভোট দিতে পারব না।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকভিলের ২১ বছর বয়সী মারকোস জিমেনেজও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির আশায় ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের বদলে ট্রাম্প বিদেশের যুদ্ধ ও অন্যান্য বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে জিমেনেজ বলেন, ডেমোক্র্যাটরা সাধারণ মানুষের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয় বলে তার মনে হয়।
অভিবাসীদের ধরপাকড়ে হতাশ ট্রাম্প-সমর্থক
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিও তার সমর্থন হারানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। পশ্চিম কানসাসের গার্ডেন সিটির বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী রেমি মার্টিনেজ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। ডেমোক্র্যাটদের তথাকথিত অতিরিক্ত উদারপন্থী অবস্থানে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিলেন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক অভিবাসীবিরোধী অভিযানে এখন হতাশ তিনি। হিস্পানিক বংশোদ্ভূত মার্টিনেজ বলেন, অপরাধীদের বহিষ্কারের বিরোধিতা তিনি করেন না। কিন্তু বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী পরিশ্রমী মানুষদেরও এসব অভিযানে আটক করা হচ্ছে।
মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য পরিচিত এবং বিপুল হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল গার্ডেন সিটিতে বহু মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় শহরটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মার্টিনেজ বলেন, তারা সবার পেছনেই লেগেছিল। গাড়ি থামিয়ে সবাইকে আটক করছিল। এখন কানসাসের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। পাশাপাশি টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে সমর্থন দিতে নিজের বিশের কোঠায় থাকা মেয়েকেও উৎসাহিত করছেন। মার্টিনেজের মতে, সরকারের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
নারীদের অধিকার ও এপস্টেইন নথি নিয়েও অসন্তোষ
তরুণীদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। টেক্সাসের ২২ বছর বয়সী সুজানা ব্রিজেস ২০২৪ সালে প্রথমবার ভোট দিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পকে বেছে নিয়েছিলেন। ক্যাথলিক রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা ব্রিজেস ট্রান্সজেন্ডার তরুণদের বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান পছন্দ করতেন না।
কিন্তু বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হতাশ তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের আচরণ, বিদেশি সহায়তা কমানো এবং হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদমাধ্যমকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিশেষ করে জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে ট্রাম্পের আচরণ এবং নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অবস্থান তাকে ক্ষুব্ধ করেছে। ব্রিজেসের অভিযোগ, প্রশাসন এমন এক অতিরিক্ত পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে, যেখানে নারীদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয় না। তিনি বলেন, আমি একজন ক্যাথলিক রক্ষণশীল, খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদী নই। আমরা নারীদের সম্মান করি।
তবে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিও তার আস্থা নেই। ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের বিষয়ে জেমস টালারিকোর অবস্থান পরিবর্তন এবং ধর্ম ও রাজনীতির মিশ্রণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে তার। তাই আসন্ন নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
তরুণদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির আকর্ষণ
রিপাবলিকানদের প্রতি হতাশার পাশাপাশি তরুণদের একাংশ ডেমোক্র্যাটদের প্রচলিত রাজনীতির বাইরেও বিকল্প খুঁজছেন। তাদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের ২৬ বছর বয়সী লিয়াম হাওয়ার্ড এর একটি উদাহরণ। রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা হাওয়ার্ড প্রথম দিকে নিজেকে স্বাধীনতাবাদী মনে করতেন এবং রিপাবলিকানদের ভোট দিতেন। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
বর্তমানে যানবাহনের জন্য জরুরি সতর্কবাতি তৈরি করেন তিনি। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কারখানায় কাজ করেও দক্ষিণ নিউ হ্যাম্পশায়ারে একটি ছোট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা বা ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। এ কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে তাকে। হাওয়ার্ডের মতে, কয়েক দশক আগে তার এই চাকরি দিয়ে একটি বাড়ি কেনা সম্ভব হতো। অথচ এখন মৌলিক আবাসন ব্যয় মেটানোই কঠিন।
এই অভিজ্ঞতা তাকে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং ভারমন্টের স্বতন্ত্র সমাজতন্ত্রী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের মতো নেতাদের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনার জরিপ অনুযায়ী, তরুণ ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী নেতাদের পছন্দ করেন। অন্য যেকোনো বয়সী গোষ্ঠীর তুলনায় এই প্রবণতা তরুণদের মধ্যে বেশি।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট না দিলেও এবার সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রার্থীদের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ভোট দেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে হাওয়ার্ডের।
দুই দলেই আস্থা হারাচ্ছেন অনেকে
তবে তরুণ ভোটারদের সবাই যে রিপাবলিকানদের ছেড়ে ডেমোক্র্যাটদের দিকে যাচ্ছেন, তা নয়। এখনও তরুণ পুরুষদের প্রায় ৪৪ শতাংশ আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পছন্দ করেন।
অ্যারিজোনার ফিনিক্সের ২৮ বছর বয়সী তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ী কনার ফ্রেডরিকসন মনে করেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করার চেষ্টা করছেন। তার মতে, ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত সঠিক না হলেও কোনো নেতাই সব ক্ষেত্রে নিখুঁত হতে পারেন না।
অন্যদিকে কানসাস সিটির ২৫ বছর বয়সী রিপাবলিকান সমর্থক রায়ান গেলিংস মনে করেন, রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত হয়ে পড়েছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আগ্রহ দেখানো নেতাদের প্রতি তার আকর্ষণ বাড়ছে—তারা ডেমোক্র্যাট, সমাজতন্ত্রী কিংবা ভিন্নমতাবলম্বী রিপাবলিকান যে দলেরই হোন না কেন।
গেলিংসের মতে, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি, বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসির মতো নেতারা সাধারণ মানুষের ব্যয়সংকট নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি আন্তরিক। তিনি বলেন, মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয় হলে তার আপত্তি নেই; বরং অপচয় হওয়ার চেয়ে সেই অর্থ সাধারণ মানুষের কাজে লাগানোই ভালো।
জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশ মনে করেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কোনোটিই সঠিক বিষয়গুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। অন্য সব বয়সী গোষ্ঠীর তুলনায় তরুণদের মধ্যে এই ধারণা সবচেয়ে বেশি।
ভোটের মাঠে অনিশ্চিত তরুণরা
যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান এখনও পরিবর্তনশীল। বয়স্ক ভোটারদের মতো তারা কোনো একটি দলের প্রতি স্থায়ীভাবে অনুগত নন। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক ইস্যু এবং প্রার্থীদের অবস্থানের ভিত্তিতে তাদের সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে।
তবে অসন্তোষ থাকলেও সেই ক্ষোভ যে ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে, তা নিশ্চিত নয়। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন। বিপরীতে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ভোট দেওয়ার হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।
তরুণদের একটি অংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিতে আগ্রহী হলেও অন্যরা এখনও সিদ্ধান্তহীন। কেউ কেউ দুই দলের প্রতিই বিরক্ত হয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা ভাবছেন।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ভোটারদের কাছে এখন দলীয় আনুগত্যের চেয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী জীবনযাপন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস