সমুদ্রের কয়েক কিলোমিটার পথই হয়তো তাদের যাত্রার সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ নয়। তার আগেই অনেকের শরীর হয়ে উঠেছে যুদ্ধ, পাচার আর নির্যাতনের মানচিত্র। ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় ব্রিটেনে আসা নারী আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে এমনই ভয়াবহ দাবি করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। তার ভাষ্য, উত্তর ফ্রান্সে পৌঁছানো নারীদের প্রায় সবাই দীর্ঘ যাত্রাপথে ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে থাকতে পারেন।
রবিবার (৪ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিক্স’ অনুষ্ঠানে সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী ররি স্টুয়ার্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উপদেষ্টা অ্যালাস্টার ক্যাম্পবেলের সঙ্গে কথোপকথনে এই মন্তব্য করেন মাহমুদ। তার অভিযোগ, কারা শেষ পর্যন্ত উত্তর ফ্রান্সে পৌঁছে ছোট নৌকায় উঠবেন, সেই বাছাইয়ের বড় অংশই অপরাধী পাচারচক্রের হাতে।
মাহমুদ বলেছেন, “সীমান্ত আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।” তার দাবি, উত্তর ফ্রান্সে অপেক্ষমাণ নারী আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের আশঙ্কা প্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়। পুরুষদেরও মারধর, হুমকি ও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তার মতে, কে ব্রিটেনে আশ্রয় চাইতে পারবেন, সেই সিদ্ধান্ত অপরাধী চক্রের হাতে থাকা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হতে পারে না।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘প্রায় সব নারী’ সংক্রান্ত বক্তব্য কোনো প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান নয়, এটি তার মূল্যায়ন। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ছোট নৌকায় আসা মানুষের প্রায় ১৩ শতাংশ ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, ১৫ শতাংশ শিশু এবং ৭২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। একই পথে আসা প্রায় সবাই পরে আশ্রয়ের আবেদন করেন।
শোষণের ঝুঁকি যে বাস্তব, তার ইঙ্গিত অবশ্য সরকারি তথ্যেও রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছোট নৌকায় ব্রিটেনে আসা প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের মধ্যে ২৬ হাজারের বেশি, অর্থাৎ প্রায় প্রতি সাতজনে একজনকে সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে সরকারি ব্যবস্থায় পাঠানো হয়েছিল। ২০২৫ সালে এই হার বেড়ে ১৯ শতাংশে পৌঁছায়।
শরণার্থী সহায়তা সংস্থা রিফিউজি কাউন্সিল মাহমুদের যৌন সহিংসতার স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটির পরিচালক ইমরান হুসেইন বলেছেন, যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো নারী ও কিশোরীরা নিজের দেশ এবং যাত্রাপথ, দুই জায়গাতেই যৌন সহিংসতার মুখে পড়েন। তবে তাঁর প্রশ্ন, বিপদ এত ভয়াবহ হলে সরকার কেন নিরাপদ ও বৈধ আশ্রয়পথ সীমিত করছে। তাঁর ভাষায়, “নারীদের সুরক্ষা মানে আরও নিরাপদ পথ, কম নয়।”
গত বছর সরকার শরণার্থীদের পারিবারিক পুনর্মিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ করেছিল। সম্প্রতি আফগান নারী ও ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন সীমিত পুনর্বাসনপথ ঘোষিত হলেও রিফিউজি কাউন্সিল বলেছে, কয়েকশ মানুষের সুযোগ পাচারচক্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
রবিবারই নরম্যান্ডির কাছ থেকে ছেড়ে আসা একটি ছোট নৌকা ইংলিশ চ্যানেলের দিকে এগোচ্ছিল। ফরাসি উপকূলরক্ষী ও উদ্ধারকারী জাহাজ সেটিকে অনুসরণ করছিল। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, সীমান্ত নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সারাক্ষণ চ্যানেল নজরদারি করছে এবং প্রতিটি আগমনকারীকে আটক, যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
মাহমুদের বক্তব্য তাই ব্রিটেনের অভিবাসন বিতর্কে নতুন এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছে। ছোট নৌকা থামানোই যদি লক্ষ্য হয়, তবে মানুষকে পাচারকারীর নৌকা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই নিরাপদ বিকল্প দেওয়া হবে কীভাবে, এখন সেই প্রশ্নের উত্তরও চাইছে মানবাধিকার ও শরণার্থী সংগঠনগুলো।