ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ও মৃতের সংখ্যা। একদিনে আরও ৯ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুতে প্রায় দেড়শ’ লোকের প্রাণ গেছে। বিছানা, মেঝে, বারান্দা কোথাও জায়গা মিলছে না হাসপাতালগুলোতে। জ্বর হলেই হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করলে ধরা পড়ছে ডেঙ্গু। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মিনিটে মিনিটে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে শহরমুখী হচ্ছেন।
৫৬ বছর বয়সী আবুল হোসেন ডেঙ্গু জ্বরে ভুগছেন সাতদিন ধরে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের বাইরে সিঁড়ির কাছে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু রোগীর জন্য নির্র্ধারিত ওয়ার্ডে ঠাঁই হয়নি তার। ফলে বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি এসেছেন গাজীপুরের মাওনা থেকে। তার পাশে একইভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন কেরানীগঞ্জ থেকে আসা আরেক ডেঙ্গু রোগী আব্দুস সাত্তার। বয়স ২১ বছর। এই ওয়ার্ডের চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, ওয়ার্ডটিতে ৪০টি সিট থাকলেও রোগী ভর্তি আছেন ৬০ জন। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। এতে চিকিৎসা দিতে গিয়ে তাদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে স্যালাইন বা মেডিসিনের কোনো অভাব নেই এখানে। একই ভবনের ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডটিও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত।
গতকাল সরজমিন দেখা যায়, মূল ওয়ার্ডে ২৯টি সিট পুরোপুরি ভর্তি ডেঙ্গু রোগীতে। এই ওয়ার্ডের দায়িত্বরত একজন নার্স মানবজমিনকে বলেন, প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে তাদের ওয়ার্ডে। গতকালও বেলা পৌনে ২টা পর্যন্ত ১১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তা নিয়ে ২৯ সিটের বিপরীতে রোগী আছেন ওয়ার্ডটিতে ৪৫ জন। হাসপাতালটিতে নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগের পুরুষ ৪০২, ৫০২ এবং ৭০২ (মহিলা) ওয়ার্ডটি এখন ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৭ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৯০৫ চিকিৎসা নিয়েছেন এবং মারা গেছেন ৩১ জন। ঢামেকে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ২৩১ জন ডেঙ্গু রোগী। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৬৪৩ জন।
আরও ৯ প্রাণহানি: এদিকে দেশ জুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ২৭১ জনে দাঁড়ালো। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৯০২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৬০ জন ডেঙ্গু রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন, বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) দুইজন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন ও সিলেট বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজনের প্রাণহানি হয়েছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) সবচেয়ে বেশি ৪০১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি এই সময়ে বরিশাল বিভাগে ২১৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭২, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৩, খুলনা বিভাগে ৩০৬, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৮, রাজশাহী বিভাগে ১০৫, রংপুর বিভাগে ৬৬ ও সিলেট বিভাগে ৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১লা জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন সহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ১২৩ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া উল্লিখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৫২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৩, বরিশাল বিভাগে ২২, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫, রাজশাহী বিভাগে ১৮, রংপুরে ৬ জন ও সিলেট বিভাগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশে অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খুব অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্য্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই মডেলের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তবে নভেম্বরে কিছুটা কমতে পারে পরিস্থিতি। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এডিস মশা শুধু দিনের বেলাতেই নয়, রাতেও মানুষকে কামড়ায়। শীতকালে কিউলেক্স মশার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ে। অন্যদিকে এডিস মশা সহজে দৃশ্যমান না হওয়ায় মানুষ অনেক সময় এটিকে গুরুত্ব দেন না।
বাংলাদেশকে ‘মশার দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে এ কীটতত্ত্ববিদ বলেন, বাংলাদেশের ঘাড়ে ডেঙ্গু চেপে বসেছে। বাংলাদেশের মতো এত মশা পৃথিবীর অন্য কোথাও তিনি দেখেননি। বাংলাদেশে মশার ১২৬টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে ৭ থেকে ৮ প্রজাতির মশার কলোনি রয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, যেসব জায়গায় এডিস মশা বেশি সেখানে টার্গেট করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে হচ্ছে সরকারের উদ্যোগগুলো ভালো কাজ দিচ্ছে না। ফলে ফলাফল আসছে না। ধীরে ধীরে ডেঙ্গু বাড়ছেই। এই বিশেষজ্ঞ আরেকটি বিষয় উল্লেখ করে বলেন, মনে হচ্ছে জনগণ সম্পৃক্ত হচ্ছে না। জনগণ সিরিয়াস না। সঙ্গে আবহাওয়া তথা বৃষ্টিপাত তো একটা কারণ আছেই।