Image description

দাম বাড়ানোর পরেও বাজারে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের তীব্র সংকট। দোকানে সারিসারি খালি সিলিন্ডার সাজানো থাকলেও নেই গ্যাস। অর্থাৎ মিলছে না রিফিল। রান্নার এই নিত্যপ্রয়োজনীয় উপাদানটি কিনতে এসে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিতে রাজি হলেও বেশির ভাগ দোকানে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সিলিন্ডার। আবার অনেক কষ্টে পাওয়া গেলেও বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে ঘরের রান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গৃহিণীরা।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা জানান, কোম্পানিগুলো থেকে চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। তারা বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির সিলিন্ডার।
রোববার খাতের ১২ কেজি এলপিজি’র দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন মূল্যবৃদ্ধির পরও বাজারের সংকট কাটেনি।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ওদিকে এলপিজি’র দাম বৃদ্ধির কারণ জানিয়েছে বিইআরসি। এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সৌদি আরামকোর অক্টোবরের জন্য প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি অনুযায়ী নতুন দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টন। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন বা ৩৩ শতাংশ। আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে এলপিজি’র বাজারে অস্থিরতার কারণ নিয়ে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অভিযোগ, ২০শে সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। ২৫শে সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
অন্যদিকে আমদানিকারকরা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শনিবার জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও তারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি’র দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। তবে তারা বিইআরসি’র নির্ধারিত দামেই পরিবেশকদের গ্যাস দিচ্ছেন। কোনো কারসাজি হয়ে থাকলে তা পরিবেশক বা খুচরা পর্যায়ে হতে পারে।

রাজধানী তেজগাঁও এলাকার জুয়েল অ্যান্ড ব্রাদার্সের বিক্রেতা দীপক মজুমদার বলেন, দশদিন আগে এক গাড়ি গ্যাস পেয়েছিলাম। তাও সাতদিন আগে ওই গাড়ি পাঠিয়েছি। ওই সাতদিনের ভাড়াও আমাদের দিতে হয়েছে। এ কারণে গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। ওই এক গাড়ি শেষ হওয়ার পর অর্ডার দিয়ে আবার গাড়ি পাঠিয়েছিলাম। সেই গাড়ি এখনো এসে পৌঁছায়নি। সাতদিন আগের আনা সেই গ্যাস বিক্রি করেছি প্রতিটি ১২ কেজির ২ হাজার ২০০ টাকায়।
হাতিরঝিলের প্রবেশমুখে ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিবেশক আহমেদ এন্টারপ্রাইজ। ওই দোকানের বিক্রেতা আব্দুল লতিফ রেজা বলেন, পরিবহন খরচের কারণে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করতে পারছি না।
মগবাজার এলাকার এসএইচ এন্টারপ্রাইজে সব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এলপিজি গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু গত দেড় মাস ধরে তীব্র সংকটের মধ্যে আছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম।

তিনি মানবজমিনকে বলেন, দোকানে সব কোম্পানির গ্যাসই রাখি, কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো সিলিন্ডারই নেই। বড় আকারের কিছু সিলিন্ডারে গ্যাস থাকলেও ১২ কেজি বা এর কম ওজনের কোনো সিলিন্ডারে গ্যাস নেই, তাই ফেরত পাঠাতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কিছুক্ষণ ওই দোকানে অপেক্ষা করে দেখা গেল, দশ মিনিটে তিনজন ক্রেতা এসেছেন ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার নিতে। কিন্তু বিক্রেতা সবাইকে ‘কোনো গ্যাস নেই’ বলেই ফেরত পাঠাচ্ছেন।

রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাসিন্দা শহিদা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাসায় তিনদিন ধরে গ্যাস নেই। দোকানে দোকানে ঘুরেও ১২ কেজির সিলিন্ডার পাচ্ছি না। দু-এক জায়গায় যা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে নির্ধারিত হারের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। চড়া দাম দিতে রাজি হলেও তারা বলছে স্টক শেষ। 
ভোগান্তির কথা স্বীকার করলেও সংকট ও চড়া দামের পেছনে কোম্পানি ও ডিলারদের দুষছেন খুচরা বিক্রেতারা। শান্তিনগর বাজারের আরিফ এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর আরিফ হোসেন বলেন, আমাদের কাছে খালি সিলিন্ডার অনেক আছে। কিন্তু কোম্পানি আমাদের রিফিল করা বোতল দিচ্ছে না। ১০টা সিলিন্ডারের অর্ডার দিলে ডিলাররা ২-৩টি দিচ্ছে। তাও আবার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এরমধ্যে আমরা কিছুটা লাভ রেখে বিক্রি করি। সরবরাহ ঠিক হলে দাম স্বাভাবিক হবে।

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, সরকার ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে, ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো লুটপাট শুরু করে দিয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে এক হাজার টাকা বেশি দিলে সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ কি বেড়েছে? বাড়েনি। তাহলে এসব গোডাউনের কয়টা সিলগালা করা হয়েছে, কতোজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে? সরকার যদি এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, জনগণের যদি এভাবে পকেট কাটা যায় তাহলে সরকার জনবান্ধব কিনা সে প্রশ্ন থেকে যাবে।

এদিকে স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, শহরে বাজারের বাড়তি খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে এলপিজি’র মূল্যবৃদ্ধি। প্রতি সিলিন্ডারে ২১০০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। নগরীর দামপাড়া ব্যাটারি গলির বাসিন্দা রিনা আক্তারের সংসারে বদলে গেছে রান্নার হিসাব। একসময় সপ্তাহে দু’-তিনদিন মাংস রান্না হতো। এখন এলপিজি’র দাম বাড়ায় মাসের খরচ মেলাতে গিয়ে রান্নার আইটেম কমাতে হচ্ছে। আগের মতো একসঙ্গে কয়েক পদ রান্না করি না। 

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোক্তা ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে এলপিজি’র সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম। ফলে কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী এলপিজি সরবরাহ না পাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, বেশি দামে সীমিত পরিমাণে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা দিয়ে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ থেকে জানান, নতুন দাম কার্যকরের পর নারায়ণগঞ্জের খুচরা বাজারে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। গতকাল নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলা, ফতুল্লার মাহমুদপুর, বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬১৩ থেকে ৬৬৩ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।