ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুথিদের আক্রমনে ছিন্নভিন্ন সৌদি আরব। সামরিক সহায়তা চেয়ে ট্রাম্পকে সৌদি প্রিন্সের ফোন। যিনিই কার্যত সৌদির প্রধান নীতিনির্ধারক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করেছেন।। আপাতত শুধুই গোয়েন্দা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প শনিবার ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টা স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেছেন, হুথিরাও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়াশিংটনকে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরান ও সৌদি উভয় ফ্রন্টে জড়িয়ে অস্ত্র ভান্ডার নিঃশেষ করতে চায় না ট্রাম্প প্রশাসন। হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত ৭৪৫ মাইল দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব—পশ্চিম পাইপলাইনটি বন্ধ রেখেছে সৌদিরা। সৌদি তেল ক্রেতারা বলছেন, এই পাইপলাইন বন্ধ থাকলে মজুদ তেল দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন চলা সম্ভব।এতে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে আগুন লাগবে। এরমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজারে সংকটের আগুন লেগেছে। প্রথমবারের মতো তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। রোববার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল জ্বালানির খুচরা মূল্য গ্যালনপ্রতি ৬.২০ ডলার ছাড়িয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এমতাবস্থায় তেল সংকট নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কূটনৈতিক আলোর শিখা দেখা দিয়েও নিভে যায়। সোমবার এ লক্ষ্যে একটি বৈঠক হবার কথা ছিল। কিন্তু ইরানের সাথে হরমুজ প্রনালীর অন্যতম অংশীদার ওমান রোববার গভীর রাতে জানিয়েছে, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে 'সর্বসম্মত মতৈক্য' বা ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল—বুসাইদি । এদিকে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে না।
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান আলোচনার জন্য 'ক্রমাগত আহ্বান' জানাচ্ছে। তবে তিনি কেবল 'সঠিক চুক্তি'র প্রতিশ্রম্নতিই দিয়েছেন।যদিও ট্রাম্পের এ ধরনের কথায় আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাসযোগ্যতায় প্রশ্ন রয়েছে। ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তেহরান ও মাস্কাটের যৌথ সিদ্ধান্তে এবং আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের অনুরোধে ওমানের বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, বৈঠকটি আয়োজনের জন্য উপযুক্ত তারিখ নির্ধারণে ইরান ওমানের সাথে সমন্বয় করবে।
উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিয়মকানুন নিয়ে ওমানের সাথে করা একটি চুক্তি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সামনে তুলে ধরার জন্যই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। এদিকে ব্যবসায়ী ও সৌদি তেলের ক্রেতারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শুক্রবার সৌদিও যে পাইপলাইনটিতে আঘাত করা হয়েছিল সেটি যদি বন্ধ থাকে, তবে রিয়াদের লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবুতে মজুদ থাকা তেল দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। বিশ্ব বড় ধরনের তেল সংকটের মধ্যে পড়বে। বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে প্রতিদিন যে লাখ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, তার ওপর এটি হবে বাড়তি একটি সংকট।
সৌদি আরব তাদের পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা এটি কতদিন বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। রয়টার্সের সাথে কথা বলা সূত্রগুলো এটি মেরামতের সময়সীমা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে; কেউ বলছে কয়েক দিন, আবার কেউ বলছে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে ইয়েমেনের ইরান—সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আন্তঃসীমান্ত হামলার ফলে ঘরবাড়ি ও একটি মসজিদের ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। বাব আল—মান্দেব প্রণালীর (যা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ‘গেট অফ টিয়ার্স’ বা ‘অশ্রম্নর প্রবেশদ্বার’ নামে পরিচিত) পেরিম দ্বীপ দখলের পর, হুথিরা পৃথকভাবে দাবি করেছে যে তারা পার্শ্ববর্তী একটি প্রদেশে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতেও আঘাত হেনেছে। লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর হুথিদের এই অগ্রযাত্রা ইয়েমেনে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সংঘাতের একটি অংশ। তাদের এই অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবের ওপর হামলা ওয়াশিংটনের জন্য একটি নতুন উভয়সংকট তৈরি করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র সৌদি আরবকে সহায়তা ও নৌচলাচল সুরক্ষিত রাখতে চাইলেও, নতুন কোনো রণাঙ্গনে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হুথিদের হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোকেও একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমস