অনলাইন জুয়ার নেশা শুধু একজনের জীবনই বদলে দেয় না, তার ধাক্কা গিয়ে পড়ে গোটা পরিবারের উপর।ভারতে অনলাইন জুয়া বন্ধে আইন হয়েছে, নিষিদ্ধ হয়েছে অর্থ জড়িত সব ধরনের অনলাইন খেলা। কিন্তু আইন হওয়ার পরও রম রমিয়ে চলছে অনলাইন জুয়া। কীভাবে নতুন ওয়েব ঠিকানা, গোপন বার্তাগোষ্ঠী, সামাজিক মাধ্যম এবং প্রচারচক্রের মাধ্যমে বেআইনি জুয়ার মঞ্চগুলি ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে, তা নিয়ে ১২ সেপ্টেম্বর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। তাতে বলা হয়, তেলেঙ্গানার নিজামাবাদ জেলার ইয়েদাপল্লি গ্রামের ২২ বছরের হরিশ করোনার সময় অনলাইনে বাজি ধরা শুরু করেছিলেন। প্রথমে অল্প টাকা দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বাজির পরিমাণ। পুলিশ জানিয়েছে যে, একপর্যায়ে অনলাইন বাজিতে প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা খরচ করেন হরিশ। গ্রামের অন্তত ১২ জনের কাছ থেকেও ধার নিয়েছিলেন তিনি। পরিবারের কাছে ঋণের পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার আগেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
হরিশের বাবা রঙ্গনাভেনি সুরেশের বয়স ছিল ৫৩ বছর। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি একটি মুদির দোকান চালাতেন। মা হেমলতার বয়স ৪৫ বছর। তিনিও স্বামীর সঙ্গে দোকানের কাজে যুক্ত ছিলেন। ছেলের ঋণ শোধ করতে পরিবারটি জমিও বিক্রি করে। তাতেও সমস্যা মেটেনি। পরে হরিশ ও তার মা একটি খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ঋণের চাপ কমেনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর, নিজামাবাদ জেলার ইয়েদাপল্লিতে নিজেদের বাড়িতেই হরিশ, তাঁর বাবা সুরেশ এবং মা হেমলতার মৃত্যু হয়। হরিশের আত্মীয় মুকেশ কুমার জানান, পাওনাদারেরা বাড়িতে এসে টাকা ফেরত চাইতে শুরু করার পর পরিবার বুঝতে পারে, ছেলে কত মানুষের কাছ থেকে ধার করেছেন। ততদিনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরিবারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা বলা হয়েছিল।
হরিশের ঘটনা বৃহত্তর সমস্যার একটি উদাহরণ। ২০২৪ সালে ভারতে প্রায় ৫৯ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ অনলাইন খেলায় যুক্ত ছিলেন। ওই বছর দেশের অনলাইন খেলাধুলার বাজারের আয় ছিল প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার। অর্থ জড়িত খেলাগুলি থেকেই এসেছিল বাজারের প্রায় ৮৬ শতাংশ আয়। ২০২৯ সালের মধ্যে এই বাজার ৯১০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে বলে শিল্পক্ষেত্রের হিসাব।
অনলাইন বাজি এখন আর নির্দিষ্ট কোনও দোকানে গিয়ে করতে হয় না। ক্রিকেট চলাকালীন স্মার্টফোনে বিজ্ঞাপন দেখে সরাসরি বাজি ধরা যায়। অনেক তরুণের ক্ষেত্রে শুরুটা হয় ভবিষ্যদ্বাণীমূলক খেলা বা অর্থ জড়িত খেলায়। টাকা হারার পর সেই টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আরও বেশি টাকা বাজি ধরার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে ধার, ঋণ এবং আরও বড় ক্ষতির চক্র শুরু হয়।
তেলেঙ্গানাতেই এমন আরও ঘটনা ঘটেছে। হায়দরাবাদে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২০ বছরের বিমান প্রকৌশল পড়ুয়া সেলাম মনোজের মৃত্যু হয়। তাঁর বাবা পুলিশকে জানিয়েছিলেন, অনলাইন খেলা ও বাজির জন্য ছেলে বন্ধুদের কাছ থেকে প্রায় তিন লক্ষ টাকা ধার করেছিলেন। আর এক ঘটনায় ২৭ বছরের গবাদি পশুর খাদ্য ব্যবসায়ী বালাগোনি পবন কুমার বিপুল টাকা বাজিতে হারান। বাবা আগের ঋণ শোধ করে সতর্ক করলেও বাজি বন্ধ হয়নি।
সমস্যা ঠেকাতে ২০২৫ সালে ভারতীয় সংসদ অর্থ জড়িত সব অনলাইন খেলা নিষিদ্ধ করার আইন পাস করে। আইনটি অর্থ জড়িত খেলার পাশাপাশি তার বিজ্ঞাপন, প্রচার এবং লেনদেনে সহায়তাও নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আইন কার্যকর হওয়ার পরও বিদেশ ভিত্তিক ও বেআইনি মঞ্চগুলি নতুন ওয়েব ঠিকানা, গোপন বার্তাগোষ্ঠী এবং প্রচারচক্রের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে। ফলে অনলাইন জুয়ার নেশার আর্থিক ও সামাজিক মূল্য এখনও দিচ্ছে বহু পরিবার।
সূত্র: আল জাজিরা