ভারতের উত্তর-পূর্ব দিল্লির লালবাগ এলাকায় নারীদের জন্য বিনামূল্যে পরিচালিত একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রকে ‘মাদ্রাসা’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে বিজেপি সমর্থক একদল মানুষ। এ সময় শতাধিক মানুষ মব সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় বলে জানানো হয়েছে। গত ৯ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর কয়েক দফায় কেন্দ্রটির সামনে জড়ো হয়ে তারা বিক্ষোভ ও হুমকি দেয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
‘ফারহা মেমোরিয়াল স্কিল সেন্টার’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানে নারীদের সেলাই, কম্পিউটার, মেহেদি, ক্যালিগ্রাফি, নার্সিং ও স্পোকেন ইংলিশ শেখানো হয়। কেন্দ্রটির পরিচালকের দাবি, এখানে কোনো ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় না এবং এটি কোনোভাবেই মাদ্রাসা নয়।
১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে প্রশিক্ষণকেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, ১১ বছর বয়সী আলফিশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী মেহেদির নকশা অনুশীলন করছে। এ সময় তিন পুলিশ সদস্য কেন্দ্রের পরিচালক মোহাম্মদ দানিশের কাছে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, অনুমতিপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চান। পুলিশ কর্মকর্তাদের এই জিজ্ঞাসাবাদ চলে শিক্ষার্থীদের সামনেই।
এর আগের দিন, ৯ সেপ্টেম্বর প্রায় একশ মানুষ কেন্দ্রটির সামনে জড়ো হয়ে সেটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করেন দানিশ। স্থানীয় বিজেপি কাউন্সিলর সুনিতা সোমের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত রাজেশ সোম ওই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বলে দাবি কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের।
ঘটনার সময় দানিশ লালবাগ পুলিশ চৌকিতে ফোন করে সহায়তা চান। পরদিন পুলিশ কেন্দ্রটিতে গিয়ে বিভিন্ন নথিপত্র পরীক্ষা করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে ‘মাদ্রাসার আড়ালে’ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ এসেছে এবং সেটি যাচাই করতেই তারা সেখানে গিয়েছেন।
পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর রাজেশ কুমার বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কোনো বিষয়ে সন্দেহ বা আপত্তি থাকলে এলাকাবাসি অভিযোগ করতে পারে। পুলিশের কাছে অভিযোগ আসার পর সেটি যাচাই করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে দানিশের অভিযোগ, তাকে থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে বলা হলেও কেন্দ্রের নারী শিক্ষার্থীদের একা রেখে তিনি যেতে পারেননি।

১০ সেপ্টেম্বর বিকেলেও কেন্দ্রটির সামনে লোকজন জড়ো হয়ে সেটি বন্ধের দাবি জানায়। দানিশ জানান, সেদিনও তারা প্রতিষ্ঠানটিকে ‘মাদ্রাসা’ বলে উল্লেখ করে। পরে তিনি আবার পুলিশ চৌকিতে ফোন করলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি তার কথা শুনে দ্রুত ফোন কেটে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই ফোনালাপের একটি রেকর্ডিংও দ্য ওয়্যারের হাতে এসেছে।
দানিশের দাবি, তিনি রাজেশ সোমের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাকে কেন্দ্রটিতে এসে কী পড়ানো হয় এবং কারা শিক্ষকতা করেন তা দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু সোম তাতে আগ্রহ দেখাননি এবং কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে অনড় থাকার কথা জানান।
১১ সেপ্টেম্বর দানিশ পুলিশ চৌকিতে লিখিত অভিযোগ করেন। পাশাপাশি অনলাইনে জনসুনভাই পোর্টালেও অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগে রাজেশ সোমকে বিক্ষোভকারী দলের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর আবারো বড় একটি দল কেন্দ্রটির বাইরে জড়ো হয়। এবার স্থানীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও ক্যামেরাপারসনও তাদের সঙ্গে ছিলেন
‘মাদ্রাসা নয়, এখানে দক্ষতা শেখানো হয়’
মে মাস থেকে প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ দানিশ। ২০২২ সালে অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যাওয়া স্ত্রী ফারহার স্মৃতিতে তিনি কেন্দ্রটির নাম দেন ‘ফারহা মেমোরিয়াল স্কিল সেন্টার’।
দানিশ বলেন, তার স্ত্রীকে পড়াশোনা ও উচ্চশিক্ষার জন্য লোনি থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। জীবদ্দশায় তিনি নিজের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও হাতে নিয়ে দেখতে পারেননি। নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যেই তিনি কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে জানান দানিশ। তার ভাষায়, সেলাই, কম্পিউটার, মেহেদি, ক্যালিগ্রাফি ও স্পোকেন ইংলিশসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আনশিকা সিং বলেন, তিনি জুন থেকে সেখানে আসছেন এবং এটিকে কখনোই মাদ্রাসা মনে হয়নি। তার ভাষ্য, কেন্দ্রের কার্যক্রম সম্পর্কে তার বাবা-মাকেও ফোন করে সেখানে তাদের মেয়েকে না পাঠানোর জন্য বলা হয়েছিল। তবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর তার পরিবারও কেন্দ্রটির প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।
আরেক শিক্ষার্থী নিশা জানান, তিনি গত দুই মাস ধরে সেখানে ক্যালিগ্রাফি শিখছেন। অন্য কোথাও এ ধরনের কোর্স করার সামর্থ্য তার নেই। কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রশিক্ষণ হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
প্রশিক্ষণকেন্দ্রের শিক্ষার্থী সামিনা বেগম ইতোমধ্যে সেখানে সেলাই শেখার পর শিশুদের পোশাক তৈরির অর্ডার পেতে শুরু করেছেন।
পাশে স্থানীয় হিন্দু প্রতিবেশীরাও
প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর দানিশের পাশে দাঁড়িয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় হিন্দু প্রতিবেশীও।
প্রেমবতী দেবী, সীমা ও আকাশ সিংহ প্রতিদিনের পরিস্থিতিতে দানিশকে সমর্থন করছেন। সীমার দাবি, কেন্দ্রটি মাদ্রাসা—এমন অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, কেউ যদি একটি ভালো উদ্যোগ বন্ধ করে দিতে চায়, তাহলে সেটির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত।
আকাশ সিংহও জানান, দানিশের প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা অবগত।
কেন্দ্রে সম্প্রতি ভর্তি হওয়া প্রীতি বলেন, তিনি মেহেদি ও বিউটিশিয়ান কোর্স করতে চেয়েছিলেন। বিনামূল্যে এবং বাড়ির কাছেই প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ায় তিনি এখানে ভর্তি হয়েছেন। তার মতে, বাড়িতে বসে থাকার চেয়ে এ ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু শেখা অনেক বেশি উপকারী।
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যেও সহাবস্থান
উত্তর-পূর্ব দিল্লির যে এলাকায় অতীতে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম সহিংসতা হয়েছে, সেখানেই ফারহা মেমোরিয়াল স্কিল সেন্টারটি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যতিক্রমী জায়গা হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এখানে হিন্দু ও মুসলিম নারীরা একসঙ্গে বসে সেলাই, কম্পিউটার, মেহেদি, ক্যালিগ্রাফি ও স্পোকেন ইংলিশ শিখছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ কেউ ইতোমধ্যে আয় করার সুযোগও পেয়েছেন।
কেন্দ্রটির শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে ৯ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এই সহাবস্থানের পরিবেশকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, একটি নারী-কেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগকে ‘মাদ্রাসা’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ওয়্যার