মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় নতুন ধরনের সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো, ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার হ্রাস এবং কম খরচে ড্রোন ধ্বংসের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই ওয়াশিংটন এ উদ্যোগ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান ও তার মিত্রদের ড্রোন হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, জাহাজ ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে এসব ড্রোন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ফলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—কম দামের ড্রোন ধ্বংস করতে কি সব সময় কোটি কোটি ডলারের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব? এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সমন্বিত জোট গড়তে চায়, যেখানে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি, রাডার ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, জাহাজ ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা একসঙ্গে ব্যবহার করা যাবে। এর মাধ্যমে হামলার তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান এবং ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংসের কাজ আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
নতুন এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চললে যুক্তরাষ্ট্রের মজুদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও তার মিত্রদের ড্রোন প্রযুক্তি এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে। ছোট ও তুলনামূলক সস্তা ড্রোন একসঙ্গে বড় সংখ্যায় পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত করে রাখা সম্ভব। এর ফলে আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করাও সহজ হয়।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় ড্রোন প্রতিরোধে বিশেষ প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক জ্যামিং, লেজার ও কম খরচের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
তবে এ উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন জোট গঠিত হলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক মেরুকরণ আরও বাড়তে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে ইরানও তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
ড্রোন এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র হিসেবে উঠে এসেছে। আর এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গড়ার পথে এগোচ্ছে। ওয়াশিংটনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে কম খরচে এবং দ্রুততার সঙ্গে এসব ড্রোন হামলা প্রতিহত করা যায়, একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো যায়।
১৩ই অগাস্ট মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ঘোষণা করে যে তারা 'ফ্যালকন স্ট্রাইক ফোর্স' গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং এই বাহিনীতে যোগদানের জন্য অঞ্চলটির দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর কাজ চলছে। তবে তারা কোনো দেশ বা সম্ভাব্য অংশীদারের নাম প্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে মূলত ড্রোন যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা