যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় অগ্রগতির দাবি কাতারের; প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায় তেহরান, হরমুজ এড়িয়ে তেল পাঠানোর বিকল্প খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো
যুদ্ধ থামানোর আলোচনা চলছে এক দিকে, অন্য দিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন শক্তির লড়াই। পাঁচ মাসের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথটি প্রায় অচল। সেই সঙ্কট কাটাতে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক তৎপরতা যেমন তুঙ্গে, তেমনই হরমুজ এড়িয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানির নতুন পথ তৈরির দৌড়ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে দিনভর ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে। হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সমঝোতা কাছাকাছি–এমন আশাবাদও ওয়াশিংটনের। তবে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটছে না। তেহরানও বারবার সরাসরি আলোচনার মার্কিন দাবি অস্বীকার করে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের কথা জানিয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের দাবি, বুধবারের মধ্যেই হরমুজ খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা। আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও। তবে তাঁর সতর্কতা–অগ্রগতি থাকলেও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারির ভাষ্য, আলোচনা পৌঁছেছে ‘অনেকটাই অগ্রসর পর্যায়ে’। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে খসড়া প্রস্তাব আদান-প্রদানে সমন্বয় করছে কাতার, ওমান ও পাকিস্তান। মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির ফোনালাপেও মতপার্থক্য কমানো এবং স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজার উপর জোর।
তবে আলোচনার মাঝেও পুরোপুরি নিরাপদ নয় হরমুজ। মঙ্গলবার ওমান উপকূলের কাছে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি পণ্যবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর। নাবিকেরা জাহাজ ছাড়লেও একজন নিখোঁজ। একই দিনে ইয়েমেনের কাছে আক্রান্ত ভারতীয় জাহাজের ১৪ নাবিককে উদ্ধারের তথ্যও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের।
দিনে ১৪০ জাহাজের জায়গায় মাত্র আটটি
যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে সাধারণত দিনে ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত। বুধবারের জাহাজ চলাচলের তথ্যে সেই সংখ্যা মাত্র আট–পাঁচটি ট্যাংকার এবং তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ। অর্থাৎ আলোচনা এগোলেও বাস্তবে প্রণালিটি এখনও প্রায় বন্ধ।
বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের পথ এই সরু জলসীমা। ফলে হরমুজের প্রতিটি অচল দিন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, জাহাজভাড়া এবং বিমার খরচে নতুন চাপ। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও তার সম্ভাব্য অর্থ–জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণের বাড়তি ব্যয়। এটি বর্তমান বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি প্রবাহের তথ্যের ভিত্তিতে একটি অর্থনৈতিক আশঙ্কা।
নতুন পথে নিয়ন্ত্রণ চায় ইরান
আলোচনার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?ইরান দীর্ঘদিন ধরে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ওমানের সঙ্গে ভাগাভাগির দাবি জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় তেহরান প্রণালিতে প্রবেশকারী জাহাজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং বেরিয়ে যাওয়া জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা চাইছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট একটি ইরানি সূত্রের। প্রয়োজন মনে করলে জাহাজের চলাচলে হস্তক্ষেপের অধিকারও চায় ইরান।
ওমানের সঙ্গে একটি নতুন বা সাময়িক নিরাপদ নৌপথ নিয়েও আলোচনা চলছে। ইরানের ভাষ্য, প্রস্তাবিত পথটি এমনভাবে পরিচালিত হবে, যাতে তেহরান ও মাসকাট–দুই পক্ষের সার্বভৌম অধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা বজায় থাকে। তবে যৌথ তদারকি এবং জাহাজ থেকে স্বেচ্ছামূলক মাশুল আদায়ের একটি ওমানি প্রস্তাব আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
হরমুজে এমন নিয়ন্ত্রণ পেলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসবে। জ্বালানি পরিবহণের উপর ইরানের স্থায়ী প্রভাব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা-নির্ভরতাও আরও বাড়বে।
হরমুজ এড়িয়ে তেল পাঠানোর দৌড়
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই হরমুজের বিকল্প তৈরিতে দ্রুত এগোচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সিরিয়া থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত–বিভিন্ন দেশ নতুন তেলনালি, স্থলপথ ও রপ্তানি বন্দর তৈরির পরিকল্পনা সামনে আনছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরামুখী প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তেলনালির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের প্রকল্পটি শেষ হলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ হরমুজ এড়িয়ে দৈনিক আরও ১২ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরবের লক্ষ্য পূর্বাঞ্চলের তেল লোহিত সাগরের বন্দর পর্যন্ত পৌঁছানো। ইরাক ও সিরিয়াও ভূমধ্যসাগরমুখী পুরোনো রপ্তানিপথ নতুন করে সক্রিয় করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে এসব পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর লোহিত সাগর অবরোধ এবং সৌদি জাহাজে হামলার দাবি দেখিয়ে দিয়েছে, হরমুজ এড়ালেই নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত নয়।
সুয়েজে চাপ বাড়লে বিপদ দ্বিগুণ
হরমুজের বিকল্প অনেক পথ শেষ পর্যন্ত গিয়ে যুক্ত হবে লোহিত সাগর ও মিসরের সুয়েজ খালের সঙ্গে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে দ্রুততম সামুদ্রিক সংযোগ সুয়েজ দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ শতাংশ চলাচল। বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহণের প্রায় ৩০ শতাংশও এই পথনির্ভর।
ফলে হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও সুয়েজেও অস্থিরতা বাড়লে বিশ্ববাণিজ্যে দ্বিমুখী ধাক্কার আশঙ্কা। জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হলে যাত্রায় গড়ে অন্তত ১০ দিন বাড়তে পারে। তার সঙ্গে বাড়তি জ্বালানি, বিমা এবং পণ্য পরিবহণের খরচ।
ইরানের পাশে চীনের ‘ঢাল’ কতটা
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার নেপথ্যে চীনের ভূমিকা নিয়েও নতুন আলোচনা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একটি বিশ্লেষণে দাবি, বহুস্তরীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ইরানে ৩০০ থেকে ৪০০টি চীনা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্য সরবরাহ করা উল্লেখযোগ্য অস্ত্রের মধ্যে কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম উঠে এসেছে। লেনদেনের আনুমানিক মূল্য ছয় থেকে সাত কোটি ডলার। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং বেইজিং বা তেহরানের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণও নেই।
এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের পুরো আকাশসীমাকে সুরক্ষিত করতে না পারলেও নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোনের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে আরও উঁচু দিয়ে যুদ্ধবিমান চালাতে অথবা ব্যয়বহুল দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে।
একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, অতিদ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র এবং মানববিহীন অস্ত্রকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ‘বৈপ্লবিক প্রযুক্তি’ হিসেবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে চীনের সামরিক বাহিনী। ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের দাবির সঙ্গে এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত নয়; তবে প্রযুক্তিনির্ভর অসম যুদ্ধের প্রতি বেইজিংয়ের আগ্রহ স্পষ্ট।
যুদ্ধবিরতি, না নতুন শক্তির সমীকরণ
কূটনীতির অগ্রগতির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। কিন্তু একটি সমঝোতা শুধু হরমুজে জাহাজ চলাচল ফেরাবে, না কি পাঁচ মাসের যুদ্ধও শেষ করবে–এখনও স্পষ্ট নয়। পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন অবরোধ, তেল রপ্তানি, নৌপথের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা–প্রতিটি প্রশ্নেই বড় ব্যবধান।
হরমুজ খুললেও মধ্যপ্রাচ্য আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প তেলনালি, সুয়েজের বাড়তি গুরুত্ব, লোহিত সাগরে হুথিদের হুমকি এবং ইরানের পাশে চীনের সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা–সব মিলিয়ে নতুন এক আঞ্চলিক সমীকরণ।
এখন প্রশ্ন, আলোচনার টেবিলে কি যুদ্ধের ইতি, না কি হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ভাগ করে নেওয়ার আড়ালে আরও বড় শক্তির লড়াইয়ের শুরু?