২০২০ সালের শেষভাগ। নাগোর্নো-কারাবাখের পাহাড়ি অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে। বিশ্ব দেখল একদম নতুন এক রণকৌশল। আর্মেনিয়ার সাঁজোয়া যান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আর শক্ত বাঙ্কারগুলো একের পর এক ধ্বংস হচ্ছিল নিখুঁত নিশানায়। অথচ আজারবাইজানের সেনাদের সরাসরি সম্মুখসমরের তেমন কোনো ঝুঁকিতেই পড়তে হয়নি। কারণ, পুরো আকাশটাই তখন নিয়ন্ত্রণ করছিল তুরস্কের তৈরি ড্রোন বায়রাক্তার টিবি-২। এই দৃশ্য দেখে সামরিক বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কার বুঝতে পারেন, প্রচলিত যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। আধুনিক রণকৌশলের নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই ড্রোনের মতো প্রযুক্তির হাতে।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এই পরিবর্তিত হিসাবনিকাশের নেপথ্যে কাজ করেছে তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাত ঢেলে সাজানোর এক সুদীর্ঘ ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি।
তুরস্কের এই সামরিক উত্থানকে কেবল অস্ত্র বিক্রির বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটা সময় ছিল, যখন নিজেদের সামরিক বাহিনীর প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় অস্ত্রের জন্য তাদের পুরোপুরি পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সেই একচেটিয়া নির্ভরশীলতার শিকল ভেঙে একটি দেশ কীভাবে বেরিয়ে এলো? কীভাবে নিখুঁত রাষ্ট্রীয় নীতি, দেশীয় প্রযুক্তি আর নিজস্ব গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করল? চলুন, সেই পেছনের গল্পটাই বিশ্লেষণ করা যাক।
একটা সময় ছিল, যখন নিজেদের সামরিক বাহিনীর প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় অস্ত্রের জন্য তাদের পুরোপুরি পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সেই একচেটিয়া নির্ভরশীলতার শিকল ভেঙে একটি দেশ কীভাবে বেরিয়ে এলো? কীভাবে নিখুঁত রাষ্ট্রীয় নীতি, দেশীয় প্রযুক্তি আর নিজস্ব গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করল?
যেখান থেকে শুরু
২০০২ সালের দিকেও তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের চিত্রটা ছিল একেবারেই ভিন্ন রকম। সে সময় তাদের সামরিক ও বিমান শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার ছিল সাকল্যে এক বিলিয়ন ডলার। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশই তখন তাদের বিদেশ থেকে কিনতে হতো। হেলিকপ্টার, যুদ্ধট্যাংক থেকে শুরু করে রাডার বা যোগাযোগব্যবস্থা—সবকিছুর জন্যই যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি বা ইতালির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল তারা।
তবে বিদেশি অস্ত্রের ওপর এই অতি-নির্ভরতার বিপদ তুরস্ক বেশ আগেই টের পেয়েছিল। সময়টা ১৯৭৪ সাল। সাইপ্রাস অভিযানের পর তুরস্কের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বসে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮—টানা তিন বছর চলা এই নিষেধাজ্ঞার ফল ছিল ভয়াবহ। শুধু দরকারি যন্ত্রাংশের অভাবে তুরস্কের বিমানবাহিনীর বহু যুদ্ধবিমান তখন রানওয়ে থেকে উড়তেই পারেনি। আঙ্কারার নীতিনির্ধারকদের কাছে সেটা ছিল একটা বড় ধাক্কা। তারা বুঝতে পারেন, নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আর সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আসেলসান, রকেটসান ও হাভেলসানের মতো সামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর।
এরপর প্রায় তিন দশক কেটে গেলেও এই খাতের অগ্রগতি ছিল বেশ ধীর। কিন্তু ২০০২ সালে একেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর হিসাবনিকাশ দৃশ্যত বদলাতে শুরু করে।
সবচেয়ে বড় মোড়টি আসে ২০০৪ সালের মে মাসে। তুরস্কের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি এক্সিকিউটিভ কমিটির (SSIK) একটি বৈঠক বসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সভাপতিত্বে নেওয়া ওই বৈঠকে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত হয়। এক ধাক্কায় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি অস্ত্র কেনার চুক্তি বাতিল করে দেয় তুরস্ক। অথচ এই চুক্তির আওতায় বিদেশ থেকে আধুনিক অ্যাটাক হেলিকপ্টার, মেইন ব্যাটল ট্যাংক ও ড্রোন কেনার কথা ছিল। রেডিমেড অস্ত্র কেনার সেই প্রথাগত রাস্তা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় বাজেটের বড় অংশ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় দেশীয় উৎপাদন ও গবেষণার দিকে।
এক ধাক্কায় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি অস্ত্র কেনার চুক্তি বাতিল করে দেয় তুরস্ক। অথচ এই চুক্তির আওতায় বিদেশ থেকে আধুনিক অ্যাটাক হেলিকপ্টার, মেইন ব্যাটল ট্যাংক ও ড্রোন কেনার কথা ছিল। রেডিমেড অস্ত্র কেনার সেই প্রথাগত রাস্তা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় বাজেটের বড় অংশ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় দেশীয় উৎপাদন ও গবেষণার দিকে।
রাষ্ট্রীয় নীতির এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল মিলতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তুরস্কের প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজের (SSB) হাতে ২০০৪ সালে প্রকল্প ছিল মাত্র ৮৪টি। দেশীয় প্রযুক্তিতে জোর দেওয়ায় ২০১০ সালের মধ্যেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৯টিতে, আর ২০১৮ সালে তা লাফিয়ে ৬৬৭টিতে পৌঁছায়।
শুধু প্রকল্পের সংখ্যা নয়, আমূল বদলে যায় আর্থিক আকারও। ২০০৪ সালে যেখানে প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলোর মোট চুক্তিমূল্য ছিল ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, ২০১৮ সালে তা ৬০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। যে দেশটিকে একসময় তার সমরাস্ত্রের ৮০ শতাংশই আমদানি করতে হতো, সেই তুরস্ক আজ নিজেদের অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজেরা তৈরি করছে।
যে দেশটিকে একসময় তার সমরাস্ত্রের ৮০ শতাংশই আমদানি করতে হতো, সেই তুরস্ক আজ নিজেদের অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজেরা তৈরি করছে।
২০১৯ সাল। তুরস্কের সামরিক খাত এ সময়ে বিশাল ধাক্কা খায়। শুধু হয় বাঁকবদল।
রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে একরকম বের করেই দেয়। অথচ তুরস্ক এই প্রকল্পের অনেক বড় অংশীদার ছিল; যুদ্ধবিমানটির প্রায় ৯০০টির বেশি যন্ত্রাংশ তৈরি হতো সেখানেই। ফলাফল? এক ধাক্কায় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ব্যবসা হারায় তুর্কি কোম্পানিগুলো।
প্রাথমিকভাবে এটা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি মনে হলেও, এই ঘটনাই তুরস্ককে নিজেদের অস্ত্র উৎপাদনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে বাধ্য করে। বিদেশি যুদ্ধবিমানের আশায় বসে না থেকে তারা মনোযোগ দেয় নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’, আলতায় ট্যাংক এবং নৌবাহিনীর প্রজেক্টগুলোর দিকে।
এখনকার তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাত কোনো একক কোম্পানির ওপর নির্ভর করে না। ছোটোখাটো যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে জটিল ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম—সবকিছুর একটা দারুণ সমন্বিত সাপ্লাই চেইন দাঁড়িয়ে গেছে দেশটিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ নাম নিঃসন্দেহে বায়কার।
সেলচুক ও হালুক বায়রাক্তারের নেতৃত্বে তৈরি ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ ড্রোনের নাম এখন সারা বিশ্ব জানে। আকাশে ১০ লাখ ঘণ্টার বেশি ওড়ার রেকর্ড গড়া এই ড্রোন সিরিয়া, লিবিয়া, আজারবাইজান থেকে শুরু করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রীতিমতো গেম-চেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইউক্রেনে তো এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, অনেক সাধারণ মানুষ ভালোবেসে নিজেদের সন্তানের নাম পর্যন্ত রাখতে শুরু করেন ‘বায়রাক্তার’।
ইউক্রেনে তো এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, অনেক সাধারণ মানুষ ভালোবেসে নিজেদের সন্তানের নাম পর্যন্ত রাখতে শুরু করেন ‘বায়রাক্তার’।
এখন পর্যন্ত পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়াসহ অন্তত ৩৫টি দেশে এই ড্রোন রপ্তানি হয়েছে। ২০২৩ সালেই বায়কারের রপ্তানি আয় ছিল ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট আয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি।
প্রতিরক্ষা খাতের ইলেকট্রনিক্সে তুরস্কের নেতৃত্ব দিচ্ছে আসেলসান। রাডার সিস্টেম, যোগাযোগ প্রযুক্তি আর ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার তৈরিতে তারা এতটাই দক্ষ যে, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রতিরক্ষা কোম্পানির তালিকায় তাদের অবস্থান ৪৩তম।
সবশেষ হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির অস্ত্র বিক্রি থেকে আয় ২৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন (৩.৪৭) ডলারে দাঁড়িয়েছে। শুধু নিজেদের সেনাবাহিনীর চাহিদা মিটিয়েই তারা থেমে নেই, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতেও তাদের সরঞ্জাম যাচ্ছে। যেমন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই পোল্যান্ডের সঙ্গে ৪১০ মিলিয়ন ডলারের একটি ইলেকট্রনিক অ্যাটাক পড সরবরাহের চুক্তি সই করেছে আসেলসান।
‘কান’ এবং রকেটসানের ক্ষেপণাস্ত্র আকাশপথে নিজেদের দাপট বাড়াতে টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই) বানাচ্ছে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’। ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও সম্পন্ন হয়ে গেছে। লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালের মধ্যে এর পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়া। এরই মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদনের শর্তে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৪৮টি ‘কান’ বিক্রির চুক্তিও সেরে ফেলেছে তারা।
অন্যদিকে, ক্ষেপণাস্ত্রের কারিগর হিসেবে কাজ করছে রকেটসান। তাদের তৈরি আতমাকা অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, তায়ফুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের জন্য তৈরি এমএএম-এল স্মার্ট মিনি মিউনিশন এখন অনেক দেশের সামরিক বাহিনীরই অন্যতম ভরসা।
আকাশ ও স্থলের পাশাপাশি সাগরেও সমান মনোযোগ দিয়েছে তুরস্ক। তাদের নিজস্ব ‘মিলজেম’ (MILGEM) প্রজেক্টে তৈরি যুদ্ধজাহাজগুলো এখন পাকিস্তান, ইউক্রেন ও মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইন্দোনেশিয়াও সম্প্রতি দুটি ইস্তিফ ফ্রিগেট কেনার চুক্তি করেছে।
তবে সবচেয়ে বড় চমকটা আসতে যাচ্ছে ‘মুগেম’ (MUGEM) দিয়ে। এটি হতে যাচ্ছে তুরস্কের প্রথম বিমানবাহী রণতরি। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ২৮৫ মিটার লম্বা আর ৬০ হাজার টন ওজনের এই বিশাল রণতরিতে অন্তত ৫০টি সামরিক উড়োজাহাজ ও ড্রোন রাখার ব্যবস্থা থাকবে।
রপ্তানির মানচিত্র
তুরস্কের অস্ত্র কারখানার সাফল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই আটকে নেই; তাদের অর্থনৈতিক খাতা খুললেও চমকে যেতে হয়। ২০০০ সালের শুরুর দিকের চরম হতাশার চিত্রটা কীভাবে বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হলো, সেই গল্পটা বেশ আকর্ষণীয়।
২০০২ সালে যেখানে দেশটির বেসরকারি প্রতিরক্ষা খাতের টার্নওভার ছিল সাকল্যে এক বিলিয়ন ডলার, ঠিক কুড়ি বছর পর ২০২২ সালে তা ১১ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আর রপ্তানির গ্রাফটা আরও ঊর্ধ্বমুখী। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, তুরস্কের বার্ষিক সমরাস্ত্র রপ্তানি দুই বিলিয়ন ডলার থেকে লাফিয়ে ২০২৪ সালে এসে সাত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যে দেশটা একসময় অস্ত্র কেনার জন্য পুরোপুরি অন্যের মুখাপেক্ষী ছিল, তারাই এখন রীতিমতো বিশ্বস্ত এক গ্লোবাল সাপ্লায়ার।
অস্ত্র বাণিজ্যের নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘সিপ্রি’ (SIPRI)-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারকদের তালিকায় তুরস্ক এখন ১৭ নম্বরে। কানাডার ঠিক নিচে আর স্পেনের এক ধাপ ওপরে থাকা তুরস্কের এই অবস্থান বার্তা দিচ্ছে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের একচেটিয়া বাজারে তারা এখন বড় প্রতিযোগী।
বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি প্রতিরক্ষা কোম্পানির তালিকায় চোখ বুলালে তুরস্কের অন্তত পাঁচটি বড় প্রতিষ্ঠানের নাম চোখে পড়বে:
• আসেলসান (৪৩তম): ইলেকট্রনিক ও রাডার সরঞ্জাম।
• টিএআই (৪৭তম): বিমান প্রস্তুতকারক।
• রকেটসান (৭১তম): ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন।
• আসফাত (৭৮তম): জাহাজ নির্মাণ।
• এমকেই (৮০তম): সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ।
একসঙ্গে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রথম সারির এই তালিকায় থাকা প্রমাণ করে যে, তুরস্ক কেবল একটা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর ভর করে নেই। স্থল, আকাশ কিংবা নৌ সব খাতের জন্যই তারা শক্ত একটা শিল্পভিত্তি দাঁড় করিয়ে ফেলেছে।
চলমান ২০২৬ সালের জন্য তুরস্কের লক্ষ্য আরও বড়। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্প থেকে তারা ১১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের ছক কষছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো তাদের ক্রেতার তালিকা। যেসব দেশ একসময় অস্ত্র বলতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকত, তারা এখন তুরস্কের দরজায় কড়া নাড়ছে। পোল্যান্ড, রোমানিয়া বা ক্রোয়েশিয়ার মতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সরাসরি তুরস্কের সরঞ্জাম কিনছে। আবার এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেও তাদের সমান কদর। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, মরক্কো থেকে শুরু করে কেনিয়ার মতো দেশগুলো এখন তুরস্কের নিয়মিত ক্রেতা।
হঠাৎ করে কেন তুরস্কের অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে সবাই? কারণটা খুব বাস্তবসম্মত। একে তো পশ্চিমা দেশগুলোর মতো তুরস্কের অস্ত্র বিক্রির পেছনে কোনো বাড়তি রাজনৈতিক শর্ত থাকে না, তার ওপর দামে বেশ সাশ্রয়ী। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, তুরস্কের অস্ত্রগুলো শুধু কাগজে-কলমের হিসাবে সেরা নয়, এগুলো বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত। ঠিক এই কারণেই তিন মহাদেশজুড়ে আজ তাদের অস্ত্রের এত চাহিদা।
তুরস্ক কিভাবে সফল হল?
তুরস্কের সমরাস্ত্র খাতের বদলে যাওয়ার বিষয়টা মোটেও আকস্মিক ঘটেনি। একটা আমদানিনির্ভর দেশ থেকে তারা যে আজ শীর্ষস্থানীয় সমরাস্ত্র রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ আর নিখুঁত রাষ্ট্রীয় নীতি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, আঙ্কারার এই সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো তাদের সুপরিকল্পিত একটা ইকোসিস্টেম। এই ইকোসিস্টেমের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ, বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, সাশ্রয়ী বিপণন কৌশল আর বহুমুখী প্রযুক্তির সমন্বয়। এই উপাদানগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেই তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তিটা এসেছে খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তুরস্ক মূলত ন্যাটোর দক্ষিণ-পূর্ব অংশের পাহারাদার হিসেবে কাজ করত। সে সময় তাদের সামরিক কাঠামোর প্রায় পুরোটাই পশ্চিমা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তুরস্কের বর্তমান নেতৃত্ব খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যে, নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। এই ভাবনা থেকেই তারা সমরাস্ত্র উৎপাদনকে শুধু নিজেদের সামরিক প্রয়োজন মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখেনি, বরং অস্ত্র রপ্তানিকে তারা সরাসরি বৈদেশিক নীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটা কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে তুরস্ক এখন তাদের সমরাস্ত্রকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর শর্তযুক্ত সামরিক সহায়তার বিপরীতে আঙ্কারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের একটা নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো খুব দরকার ছিল। তাই ২০১৮ সালে তুরস্ক সরকার তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ব্যবস্থায় বড়সড় একটা কাঠামোগত সংস্কার আনে। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ বা এসএসবি নামের সংস্থাটিকে সরাসরি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা বা উৎপাদনের সিদ্ধান্তগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেত। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই দীর্ঘসূত্রতা দূর করে সরাসরি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার ফলে প্রজেক্ট অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ আর গবেষণায় বিনিয়োগের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। সামরিক বাহিনীর কী প্রয়োজন আর শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক এই দ্রুততাই সমরাস্ত্র শিল্পের আধুনিকায়নে নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিরক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার নীতি তুরস্কের সমরাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় গুণগত পরিবর্তনটা এনেছে। বিশ্বের অনেক দেশেই সামরিক শিল্প শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকে। তুরস্ক এই ধারণার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বায়কারের উত্থান এই নীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ বা টিএআই যখন বড় পরিসরে যুদ্ধবিমান বা স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ করছে, বায়কার তখন অপেক্ষাকৃত কম খরচে মানববিহীন আকাশযান তৈরিতে মনোযোগ দেয়। সরকারি ও বেসরকারি খাতের এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পুরো শিল্পেই উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে বর্তমানে তুরস্কে ছোট ও মাঝারি আকারের কয়েক হাজার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা মূল অস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে নানা ধরনের সেন্সর, সফটওয়্যার আর ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে।
প্রযুক্তির এই উন্নয়ন শুধু ল্যাবরেটরিতেই আটকে রাখেনি তুরস্ক। তাদের উৎপাদিত সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় বিক্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে খোদ বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র। সিরিয়া, লিবিয়া, নাগোর্নো-কারাবাখ এবং সর্বশেষ ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি তুরস্কের সামরিক সরঞ্জামগুলোর সক্ষমতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করেছে। সিরিয়ার ইদলিবে অপারেশন স্প্রিং শিল্ড পরিচালনার সময় তুরস্ক প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকেজো করার কৌশল দেখায়। লিবিয়ায় জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে টিকিয়ে রাখতেও এই একই ড্রোন কার্যকর ভূমিকা রাখে। এরপর ২০২০ সালে নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে আর্মেনিয়ার প্রচলিত সামরিক কাঠামোর বিপরীতে বায়রাক্তার টিবি-টু ড্রোনের সফল ব্যবহার সারাবিশ্বের সামরিক কৌশলবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সাঁজোয়া বহর ঠেকাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে কোনো অস্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সেটা বাস্তব যুদ্ধে কতটা কার্যকর তার ওপর। তুরস্কের সমরাস্ত্রগুলো এই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ায় এগুলোর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
এই বর্ধিত চাহিদার পেছনে তুরস্কের সমরাস্ত্রের সাশ্রয়ী মূল্য এবং শর্তহীন বিক্রয় নীতি বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমকিউ-নাইন রিপার ড্রোনের দাম প্রায় তিন কোটি ডলার। অন্যদিকে তুরস্কের একটি বায়রাক্তার টিবি-টু ড্রোনের দাম ৫০ লাখ ডলারের কাছাকাছি। দামের এই বড় পার্থক্যের কারণে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম কেনা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
শুধু দাম নয়, অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো তুরস্ক কঠোর রাজনৈতিক বা মানবাধিকার বিষয়ক কোনো শর্ত আরোপ করে না। অনেক রাষ্ট্র আছে যারা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে তাদের পছন্দের সমরাস্ত্র কিনতে পারে না, অথবা কেনার পর তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধের সম্মুখীন হয়। তুরস্ক এই দেশগুলোর জন্য একটা আদর্শ বিকল্প হয়ে উঠেছে। সাশ্রয়ী মূল্য এবং রাজনৈতিক শর্তহীনতার এই কৌশল কাজে লাগিয়ে তুরস্ক বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারের একটা বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে।
তুরস্ক সামরিক প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি শাখাতেই তারা নিজেদের সক্ষমতা বিস্তৃত করেছে। আকাশযুদ্ধের জন্য ড্রোন বা যুদ্ধবিমানের বাইরে স্থলবাহিনীর জন্য সাঁজোয়া যান তৈরিতে কাজ করছে ওতোকার, বিএমসি এবং এফএনএসএসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তৈরির নেতৃত্বে আছে এসটিএম। নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম নানা ধরনের মিসাইল এবং রকেট তৈরি করছে রকেটসান।
অন্যদিকে এসব সামরিক যানের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করা রাডার, সেন্সর এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বানাচ্ছে আসেলসান ও হাভেলসানের মতো প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একটা যুদ্ধজাহাজ তৈরি হলে সেখানে রকেটসানের মিসাইল আর আসেলসানের রাডার যুক্ত হচ্ছে। এই বহুমুখী উৎপাদন সক্ষমতাই তুরস্ককে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
এই সুদৃঢ় সাপ্লাই চেইন এবং শিল্পভিত্তি তুরস্ককে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা শুধু নিজেদের দেশের সামরিক প্রয়োজনই মেটাচ্ছে না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সমরাস্ত্র সরবরাহ করে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্রযন্ত্রের সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর বাস্তবসম্মত বিপণন কৌশলের এই সমন্বিত রূপই মূলত তুরস্কের সামরিক খাতের বর্তমান সাফল্যের মূল কাঠামো তৈরি করেছে।
তুরস্কের দীর্ঘদিনের সামরিক পরিকল্পনা যে কতটা নিখুঁত ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালে এসে। এই বছরটিতে দেশটির সামরিক প্রযুক্তি প্রচলিত সমরাস্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে মহাকাশ এবং নৌ-যুদ্ধের নতুন কৌশলে প্রবেশ করেছে। নিজেদের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যোগাযোগ স্যাটেলাইট তুর্কসাত ৬এ সফলভাবে মহাকাশে স্থাপন করেছে তারা। নিজেদের একটা স্যাটেলাইট থাকা কেবল টেলিযোগাযোগের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক তাদের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিদেশি নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। দূরপাল্লার ড্রোন পরিচালনা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌবাহিনীর জাহাজের সঙ্গে নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদানের জন্য এই নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এখন একটা অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
মহাকাশে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নৌ রণকৌশলেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে দেশটি। তুরস্কের বহুমুখী অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ বা উভচর যুদ্ধজাহাজ টিসিজি আনাদোলু থেকে বায়রাক্তার টিবি-৩ ড্রোনের সফল উড্ডয়ন ও অবতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এই ড্রোনের ডানা ভাঁজ করে রাখা যায়, যা মূলত ছোট রানওয়ের জাহাজে ব্যবহারের জন্যই বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে। একটা বিমানবাহী রণতরি থেকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় মানববিহীন আকাশযানের উড্ডয়ন ও অবতরণের এই পরীক্ষা নৌ-যুদ্ধের প্রচলিত ধারণা অনেকটাই বদলে দিয়েছে। এর ফলে তুরস্ক এখন নিজেদের উপকূল থেকে হাজার মাইল দূরে গিয়েও কোনো বিদেশি ঘাঁটির সাহায্য ছাড়া আকাশপথে নজরদারি ও আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।
আকাশপথে তুরস্কের মহাকাশ শিল্পের আরেকটা বড় অর্জন হলো নিজস্ব জেটচালিত ট্রেইনার এবং লাইট অ্যাটাক উড়োজাহাজ হুরজেত। সম্প্রতি এই উড়োজাহাজ শব্দের চেয়ে বেশি গতি মাখ ১ দশমিক ২ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বৈমানিকদের আধুনিক যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য হুরজেত তৈরি করা হলেও, এটি হালকা আক্রমণকারী বিমান হিসেবেও কাজ করতে পারে। পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কান চালানোর আগে পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য এই সুপারসনিক হুরজেত একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শব্দের বেগ অতিক্রম করার এই সক্ষমতা প্রমাণ করে যে তুরস্কের প্রকৌশলীরা এখন উচ্চগতির অ্যারোডাইনামিকস এবং ইঞ্জিন প্রযুক্তিতেও যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছেন।
প্রযুক্তিগত এই অর্জনগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক আর্থিক বিনিয়োগ। ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাস যুদ্ধের পর শুরু হওয়া অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সময় থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তুরস্ক নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রায় ৩৭৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। অর্থনৈতিক নানা উত্থান-পতন এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপের মধ্যেও এই খাতে রাষ্ট্রের বরাদ্দ কখনো কমানো হয়নি। সামরিক গবেষণাকে রাষ্ট্র কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তা ২০২৫ সালের বাজেটের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। এই নির্দিষ্ট অর্থবছরে তুরস্ক তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত দেশীয় সমরাস্ত্রের গবেষণা, নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বৃহদায়তন প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার কাজে ব্যয় করা হচ্ছে।
বিনিয়োগের এই সুফল শুধু যন্ত্রপাতির উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি একটা বিশাল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতে সরাসরি কর্মরত পেশাজীবীর সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এক দশক আগেও যেখানে এই খাতে দক্ষ প্রকৌশলীর অভাব ছিল, সেখানে আজ হাজার হাজার তরুণ বিজ্ঞানী, সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্পের সরাসরি সংযোগ তৈরি হওয়ায় তুরস্ক এখন আর শুধু প্রযুক্তি আমদানিকারক দেশ হিসেবে বসে নেই, বরং তারা মেধা এবং মানবসম্পদ বিকাশের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে তুরস্কের উত্থানের পেছনে প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঙ্কারা তাদের সমরাস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করলেও বিশ্লেষকরা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। কারণ, সামরিক যান বা ড্রোনের কাঠামোগত অংশ নিজেদের তৈরি হলেও, মূল যন্ত্রাংশের জন্য তারা মূলত বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল।
এই নির্ভরতার প্রধান উদাহরণ ইঞ্জিন ও মাইক্রোচিপ। তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN) যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি জেনারেল ইলেকট্রিক ইঞ্জিন ব্যবহার করছে। নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরির কাজ চলমান থাকলেও, যুদ্ধবিমান বা ট্যাংকের ইঞ্জিন তৈরি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার বিষয়। ‘আলতায়’ ট্যাংকের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে। জার্মানি ইঞ্জিন ও ট্রান্সমিশন সিস্টেম সরবরাহ বন্ধ করায় প্রকল্পটি আটকে যায় এবং পরে তুরস্ক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে এগুলো সংগ্রহ করে। মাইক্রোচিপ, সেন্সর ও মেটালার্জির মতো ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরতা আঙ্কারার সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও রয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্রয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর ‘কাটসা’ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে তুরস্ক এফ-৩৫ প্রকল্প থেকে বাদ পড়ে এবং মার্কিন প্রযুক্তি প্রাপ্তি তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। পশ্চিমা দেশগুলোও তুরস্ককে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে। ২০২০ সালে নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে টিবি-টু ড্রোন ব্যবহারের পর কানাডা তুরস্কে অপটিক্যাল ক্যামেরা ও সেন্সর রপ্তানি বন্ধ করে। আসেলসান নিজস্ব প্রযুক্তিতে এর বিকল্প তৈরি করলেও, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা তাদের সাপ্লাই চেইনের ফাটল তুলে ধরেছে।
প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের বাইরে তুরস্কের অস্ত্র বিক্রি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচনা রয়েছে। তুরস্ক সামরিক সরঞ্জামকে বাণিজ্যিক পণ্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে তারা বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে যুক্ত হচ্ছে।
ইথিওপিয়ার তাইগ্রে অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্কের সরবরাহ করা ড্রোন ব্যবহারের কারণে বেসামরিক প্রাণহানির অভিযোগ তোলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সোমালিয়ায় ড্রোন সরবরাহ ও সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির কারণে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া, লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে ড্রোন সরবরাহের কারণে ফ্রান্স, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
শর্তহীন অস্ত্র বিক্রির কৌশল সাময়িকভাবে নতুন বাজার তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। সংঘাতপ্রবণ এলাকায় অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তুরস্ক বিভিন্ন অঞ্চলের প্রক্সি যুদ্ধের অংশীদার হচ্ছে। প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার অভাব এবং সমরাস্ত্র কূটনীতির কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি তুরস্কের সামরিক শিল্পের ভবিষ্যৎ যাত্রাপথে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের পাঠ
বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। আয়তন, অর্থনীতি আর সামরিক শক্তিতে তারা অনেক বড়। এমন একটি দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রথাগত অস্ত্র কেনা বা সৈন্য বাড়ানো বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের যে প্রচ্ছন্ন চাপ, তা ঠেকাতে শুধু কূটনীতি যথেষ্ট নয়। একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে দরকার দৃশ্যমান প্রতিরোধ সক্ষমতা। সামরিক পরিভাষায় একে বলে ডেটারেন্স। ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশ এখন প্রথাগত বড় বাহিনীর বদলে অসম যুদ্ধের (অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার) দিকে ঝুঁকছে। আর এই নতুন কৌশলের কেন্দ্রে চলে এসেছে তুরস্ক।
কৌশলটার নাম সজারু নীতি (পরকুপাইন স্ট্র্যাটেজি)। গায়ে কাঁটা থাকলে বড় প্রাণীও সজারুকে গিলতে ভয় পায়। বাংলাদেশ ঠিক এই মডেলেই এগোতে চাইছে। বিশাল ট্যাংক বহর বা পদাতিক বাহিনীর বদলে ড্রোন, অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল আর ইলেকট্রনিক জ্যামিং সিস্টেমের মজুত বাড়ানো হচ্ছে। তুরস্কের বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোন বা আসেলসানের রাডার সিস্টেম এই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। ইউক্রেন যুদ্ধে ঠিক এভাবেই বিশাল রুশ বাহিনীকে আটকে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের খরচ এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে প্রতিপক্ষ আক্রমণ করার আগে হিসাব মেলাতে বাধ্য হয়। এটি শুধু স্থলসীমান্তে নয়, বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারির ক্ষেত্রেও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে।
তবে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের এই সামরিক বোঝাপড়া শুধু অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানায় যৌথ উৎপাদনের কথা চলছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্ন। উৎপাদন বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে শুধু জোড়া লাগানো বা স্ক্রু-ড্রাইভার অ্যাসেম্বলি হলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো লাভ নেই। আধুনিক অস্ত্রের আসল শক্তি বাইরের খোলস নয়। এর মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে সফটওয়্যার, সেন্সর আর যোগাযোগের এনক্রিপশন কোডের ভেতর। যুদ্ধকালীন জরুরি মুহূর্তে সরবরাহকারী দেশ যদি কমান্ড সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে দেয়, তবে ওই ড্রোন বা রাডার মুহূর্তেই অকেজো হয়ে যাবে। তাই চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা জরুরি।
এই প্রযুক্তি দেশে আনার পর তা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি নিজস্ব ইকোসিস্টেম দরকার। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বুয়েট বা এমআইএসটির মতো কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করে ডেডিকেটেড মেটালার্জি ও সফটওয়্যার সেল গঠন করা যেতে পারে। লক্ষ্য হতে হবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ছাড়াই যেন বাংলাদেশ নিজস্ব ব্যাটল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার আপডেট করার সক্ষমতা অর্জন করে। দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি না হলে, প্রথাগত চীনা অস্ত্রের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ কেবল তুরস্কের ওপর নতুন করে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে চাইলে এই নির্ভরতার জায়গা থেকে বের হতেই হবে।
সামরিক এই রূপান্তরের প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পড়বে। ভারত বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিকভাবে নেবে না। নিজেদের সীমানার এত কাছে এমন নিখুঁত প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে ওঠাকে দিল্লি কৌশলগত ঘেরাও হিসেবে দেখতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সমরাস্ত্র বাজারের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী চীন। আঙ্কারার প্রভাব বাড়তে থাকলে বেইজিং তাদের বাজার ধরে রাখতে আরও কম দামে বা সহজ শর্তে নতুন প্রযুক্তি সাধতে পারে। আবার বঙ্গোপসাগরের মতো কৌশলগত অঞ্চলে ড্রোনের বিস্তার এবং নজরদারি বাড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রও খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রতিরক্ষা খাতে এই বড় বিনিয়োগের সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। সমরাস্ত্র কেনা এবং কারখানা স্থাপন মানেই বিপুল পরিমাণ ডলারের ব্যয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামো খাতের বাজেটের সাথে এর এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। পাশাপাশি এসব বড় সামরিক চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। অফসেট ডিল, কমিশন এবং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির ভেতরে কী শর্ত থাকছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক পর্যায়ে বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। জনসাধারণের করের টাকায় কেনা প্রযুক্তির চুক্তিগুলো অস্বচ্ছ থাকলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই জনমনে সংশয় তৈরি হবে। তাই পুরো উদ্যোগে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
উপসংহার
গত শতকেও নিজেদের সামরিক বাহিনীর একটা সাধারণ অস্ত্রের জন্য তুরস্ককে পশ্চিমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। আর আজ? খোদ পরাশক্তিগুলোও এখন আঙ্কারার সমরাস্ত্র কিনতে লাইন দিচ্ছে।
আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে দাপট দেখানোর নিয়ম এখন আর আগের মতো নেই। এখন বিশ্বমঞ্চে তারাই প্রভাব ধরে রাখবে, যাদের হাতে হালনাগাদ প্রযুক্তি আছে এবং যারা যুদ্ধের ময়দানের তাৎক্ষণিক চাহিদা বুঝে চটজলদি সমরাস্ত্র বানিয়ে রপ্তানি করতে পারে। তুরস্কের নীতি নির্ধারকরা ইউরোপের অনেক বাঘা বাঘা দেশের আগেই এই পরিবর্তনের আঁচ পেয়েছিলেন।
একের পর এক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সাপ্লাই চেইনে পদে পদে বাধা আর ভূরাজনৈতিক চাপ এত কিছুর পরও তুরস্ক বসে থাকেনি। অন্যের ওপর নির্ভরতা ঝেড়ে ফেলে কীভাবে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হয়, আমদানিনির্ভর যেকোনো দেশের জন্যই আঙ্কারার এই উত্থান হতে পারে একটা দারুণ কেস স্টাডি।
1. Baykar. “Turkish drone Bayraktar TB2 reaches milestone with 1 million flight hours.” TRT World, 10 Dec. 2024.
2. C4Defence. “Key Developments in the Turkish Defense Industry in 2025.” C4Defence, 3 Mar. 2026.
3. Chiacchio, Giovanni. “Strategic Autonomy: The Evolution of the Turkish Defense Industry.” Hariciye, 12 Dec. 2025.
4. Daily Sabah. “Global Image of Turkish Defense Industry.” 26 Aug. 2025.
5. Daily Sabah. “Historic Advances, World Firsts Define Türkiye’s Defense Sector in 2025.” 31 Dec. 2025.
6. Daily Sabah. “Türkiye’s Naval Armed Industry: A Rising Power.” 30 Jan. 2025.
7. Defence Industry Agency (SSB). “About Us.” Republic of Türkiye Presidency of Defence Industries.
8. DefenceWeb. “Turkey’s Booming Defence Exports.” 30 Dec. 2025.
9. Demir, İsmail. “Transformation of the Turkish Defense Industry.” Insight Turkey, 22 Sep. 2020.
10. Gulf International Forum. “Blueprints for Autonomy: Turkey and the Gulf Partnership.” 2 Dec. 2025.
11. Institude.org. “The Proliferation of Bayraktar TB2 Drones and Their Risks.” 7 Apr. 2023.
12. Politics Today. “A Brief History of 100 Years of the Turkish Defense Industry.” 6 Nov. 2023.
13. RSDI. “Evolution of Türkiye’s Defense Industry: Drivers and Its Nexus with Foreign Policy.” 9 Sep. 2025.
14. The New Arab. “Defence Diplomacy: How Turkey Is Arming Itself, and the World.” 22 Sep. 2025.
15. Trends Research & Advisory. “Exporting Power: Türkiye’s Defense Industry.” 17 Dec. 2025.
16. Türkiye Today. “Türkiye’s Defence Rise: From Dependent Consumer to Global Powerhouse.” 9 May 2026.
17. Turkish Minute. “Turkey’s Defense Industry Posts Record Exports.” 4 Dec. 2025.
18. Turkish Minute. “Turkish Defense Industry Revenues Exceed $10 Billion in SIPRI Ranking.” 1 Dec. 2025.
19. Ukraine Arms Monitor. “Bayraktar TB2 Drones and Ukraine-Türkiye Strategic Defence Partnership.” 20 Sep. 2025.
20. Times of Bangladesh. (2025, October 2). Bangladesh to fortify defence industry with Turkey’s aid.
21. New Age Bangladesh. (2023). Building defence industry in Bangladesh.
22. India.com. (2025, July 6). From Turkish rockets to drones, Bangladesh’s anti-India ‘kill chain doctrine’ is complete.
23. The Asia Live. (2025, April 11). Bangladesh plans drone fleet expansion with Bayraktar TB2.
24. RAND Corporation. (n.d.). Asymmetric warfare.