বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক চরম উত্তেজনার মধ্যেও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার পারমাণবিক কূটনীতি এবং বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির এক চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। পাঠকদের জন্য এনডিটিভির সেই বিশেষ এক্সপ্লেইনারটি (বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন) নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো-
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ‘পারমাণবিক স্থাপনায় যে কোনো ধরনের হামলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত’। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অবস্থিত এই বৈশ্বিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাটির প্রধানের এমন বক্তব্য মূলত বর্তমান বিশ্বের এক নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। আধুনিক যুদ্ধ ও সংঘাতগুলোতে বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যেভাবে অভূতপূর্ব ঝুঁকির মুখে পড়ছে, গ্রোসির এই মন্তব্য তারই গুরুতর প্রতিফলন।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। একসময় যুদ্ধ চলাকালেও যেসব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গবেষণাগারকে ছোঁয়া বিপজ্জনক ও অস্পৃশ্য মনে করা হতো, সেগুলো এখন সরাসরি যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে ইরানের নাতাঞ্জ, ফোর্ডো ও ইস্ফাহানের মতো সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলা ও ক্ষতির আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে।
এছাড়া ইরানের বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামোগুলো এখন আর সামরিক আগ্রাসনের বাইরে নেই।
পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত হানার এই বিপজ্জনক প্রবণতার পেছনে অবশ্য ইতিহাস রয়েছে। বিগত দশকগুলোতে ইরাক ও সিরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের চালানো হামলা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়েছিল। আর অতি সম্প্রতি, খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় বাঙ্কার-বাস্টার বোমাসহ শক্তিশালী সামরিক হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনা বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতায় অত্যন্ত বিপজ্জনক এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার উদ্দেশ্যে তৈরি এই বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ, এই ধরনের স্থাপনায় সামান্যতম ক্ষতি হলেও যে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়বে, তা কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত মেনে চলবে না; বরং মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জোর দিয়ে বলেছেন, এই পারমাণবিক ঝুঁকি অত্যন্ত বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক। পারমাণবিক স্থাপনার ওপর যে কোনো হামলা সংস্থাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। তবে আইএইএ শুধু সতর্কবার্তা দিয়েই হাত গুটিয়ে বসে থাকে না, বরং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি মাঠে নেমে কাজ করে। যে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের মতো চরম যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সংবেদনশীল এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। গ্রোসি স্পষ্ট মনে করিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক আইনে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং বিশ্বশান্তির স্বার্থে এই নীতি অবশ্যই সবাইকে কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
বর্তমান বিশ্বের এই বিপজ্জনক ও পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে, তিন দশক ধরে চলে আসা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা না করার দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটির বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ও অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শত্রুতা ও সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। অতীতে তারা একাধিক বড় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে কোনো প্রথাগত কূটনৈতিক আলোচনাও নেই।
এমনকি অতি সম্প্রতি, ২০২৫ সালেও দেশ দুটি ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে চার দিনব্যাপী এক ভয়াবহ সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। তবে রণক্ষেত্রে এমন তীব্র উত্তেজনা ও সক্রিয় বৈরিতা সত্ত্বেও, একটি জায়গায় দুই দেশই নজিরবিহীন সংযম দেখিয়ে আসছে। ভারত বা পাকিস্তান কেউই কখনো একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি।
এই সংযম কিন্তু আকস্মিক কোনো বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যা ভঙ্গুর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে এখনো পর্যন্ত অন্যতম টেকসই ও কার্যকর ‘আস্থা-নির্মাণকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে টিকে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তান কেউই বৈশ্বিক ‘পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি’ বা এনপিটি-তে স্বাক্ষর করেনি। তবে, তারা ১৯৮৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ‘পারমাণবিক স্থাপনা ও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে হামলা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ দিয়ে একে অপরের সঙ্গে শক্তভাবে আবদ্ধ।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর দূরদর্শিতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। এই চুক্তির মূল অঙ্গীকার অত্যন্ত স্পষ্ট; অর্থাৎ উভয় পক্ষই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কখনোই একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনার ক্ষতিসাধন বা ধ্বংস করার কোনো চেষ্টায় অংশ নেবে না কিংবা কাউকে প্ররোচিত করবে না।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী দিক হলো পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তালিকার বার্ষিক বিনিময়। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি, ভারত ও পাকিস্তান একই সঙ্গে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ পরমাণু কেন্দ্রের হালনাগাদ তালিকা একে অপরকে হস্তান্তর করে। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রথাটি আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এমনকি চলতি বছরের শুরুতে দুই দেশ টানা ৩৫তম বারের মতো এই তালিকা বিনিময় সম্পন্ন করেছে।
এই তালিকায় দুই দেশের সব ধরনের বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনা, বিদ্যুৎ চুল্লি, গবেষণা কেন্দ্র, জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অবকাঠামোর বিবরণ থাকে। চরম স্বচ্ছতার সঙ্গে এই তালিকা ভাগ করে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো যে কোনো যুদ্ধ বা সংঘাতের পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই যেন এই স্থাপনাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং সেখানে ভুল করেও কোনো হামলা না চালায়। এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলেই চরম উত্তেজনার মাঝেও দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের পূর্বাভাসযোগ্যতা ও পারস্পরিক আস্থা বজায় থাকে।
নয়াদিল্লির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের (এনএসএবি) সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত শ্রী ডিবি ভেঙ্কটেশ ভার্মা এর তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, ‘পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা না করার বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের এই চুক্তিটি গোটা বিশ্বে অনন্য।’ বৈশ্বিক পারমাণবিক ব্যবস্থায় এই ধরনের প্রতিশ্রুতি যে কতটা বিরল, তিনি মূলত সেটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
জাতিসংঘে ভারতের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও আইএইএ-তে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবীণ রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আকবরউদ্দিনও এই মূল্যায়নকে জোরালো সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে এই চুক্তি সত্যিই অতুলনীয়।’
এই চুক্তিটিকে আরও বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়েছেন সৈয়দ আকবরউদ্দিন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্ব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলার মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতার সাক্ষী হচ্ছে। এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তানের এই সমঝোতাটি একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা বিগত কয়েক দশক ধরে সফলভাবে কাজ করে আসছে।
চরম সামরিক বা রাজনৈতিক সংকটকালেও এই চুক্তিটির কার্যকারিতা একটুও কমেনি, বরং দুই দেশের প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে। চুক্তিটি মূলত উভয় দেশকে তালিকাভুক্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে বাধ্য করে। আর প্রতি বছরের শুরুতে তথ্য ও তালিকার এই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবিক অর্থেই আরও বেশি শক্তিশালী ও টেকসই করে তোলে।
আকবরউদ্দিন তার স্মৃতিরোমন্থন করে জানান, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ব্যক্তিগতভাবে বার্ষিক এই তালিকা বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় এটিকে কেবলই একটি গতানুগতিক বা আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক প্রক্রিয়া মনে হলেও, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এর প্রকৃত তাৎপর্য ও গভীরতা স্পষ্ট হচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যে এমন একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা পারমাণবিক ক্ষেত্রে যে কোনো আকস্মিক উত্তেজনা বৃদ্ধি রুখে দিতে পারে।
এমনকি অতি সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিঁদুর’র মতো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সময়েও, যখন দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল এবং পুরোদমে সামরিক অভিযান চলছিল, তখনও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু না করার এই নীতিটি অক্ষরে অক্ষরে বজায় ছিল।
বর্তমান বিশ্বের জন্য এই চুক্তি থেকে একটি বড় শিক্ষা রয়েছে বলে মনে করেন আকবরউদ্দিন। তিনি পরামর্শ দেন যে, এই ধরনের সফল দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাগুলোকে নীতিগতভাবে আরও বৃহত্তর বা বহুপাক্ষিক কাঠামোতে রূপান্তর করা যেতে পারে। কারণ, পারমাণবিক ঝুঁকি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। তেজস্ক্রিয়তা কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত চেনে না; ফলে একটি দেশে কোনো পরমাণু দুর্ঘটনা ঘটলে, তা মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র অঞ্চলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি আরও যুক্তি দেন যে, এই সংকটে একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা বিদ্যমান সংযমের দৃষ্টান্তগুলোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে। ভারত-পাকিস্তান চুক্তিটি বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, যুদ্ধের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন চরম শত্রুভাবাপন্ন প্রতিপক্ষরাও নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে একটি সাধারণ ও ন্যূনতম বোঝাপড়ায় আসতে পারে।
অন্যদিকে, আইএইএ-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি এ বিষয়ে একটি সতর্ক কিন্তু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি সম্পর্কের পূর্বাভাসযোগ্যতা বৃদ্ধি ও ঝুঁকি হ্রাসকারী এই ব্যবস্থার গুরুত্ব স্বীকার করলেও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এক অঞ্চলের মডেল অন্য অঞ্চলে হুবহু বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতা, নিরাপত্তা সংকট এবং প্রযুক্তিগত ভিন্নতা রয়েছে।
তবে গ্রোসি একটি মৌলিক ও সর্বজনীন নীতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও আইনি কাঠামো ইতোমধ্যেই রয়েছে যে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো যাবে না। বর্তমান ও ভবিষ্যত বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই আন্তর্জাতিক নিয়মটি সমুন্নত রাখা অত্যন্ত অপরিহার্য।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংস্থাটি কেবল পর্যবেক্ষণ বা মধ্যস্থতাই করে না, বরং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সরাসরি উপস্থিত থেকে ঝুঁকি প্রশমনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনা যাতে কোনো বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনায় রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তিগত তদারকি অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তীব্র সংঘাত অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও আইএইএ-র বিশেষ দলগুলো এখনো জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অবস্তান করছে। উল্লেখ্য, প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এবং ৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিশাল স্থাপনাটিতে মাঝে মাঝেই হামলা চালিয়ে দুই দেশ একে অপরকে দোষারোপ ও হয়রানি করছে।
তথাপি, একটি বড় বৈশ্বিক উদ্বেগ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে আরও বেশি দেশ পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। ফলে যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামোগুলোর এই অরক্ষিত ও দুর্বল অবস্থা এখন একটি গুরুতর আন্তর্জাতিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিতাপের বিষয় হলো, বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো যেখানে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেখানে টিক একইভাবে এর সঙ্গে জড়িত মারাত্মক ঝুঁকিগুলোকেও সমানে উসকে দিচ্ছে। এই অনিশ্চিত পরিবেশে ভারত-পাকিস্তান মডেল স্থিতিশীলতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে ‘কঠিন ও বৈরী প্রতিবেশী’ হিসেবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও দেশ দুটি প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সংযম বজায় রাখা সম্ভব। প্রতি বছরের শুরুতে পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা বিনিময়, স্পষ্ট অনাক্রমণ চুক্তি এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই চুক্তির একটি বারের জন্যও লঙ্ঘন না হওয়া; এই সবই একটি অত্যন্ত সফল ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে।
যেখানে ভারত আগামী বছরগুলোতে তাদের পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে, সেখানে এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই চুক্তিগুলো মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কা কমিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বীমাকারীদের উদ্বেগ দূর করে। একইসঙ্গে নিশ্চিত করে যে, কোনো আকস্মিক সংঘাতের কারণে যেন এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আকবরউদ্দিন এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত ও পাকিস্তান তাদের সামগ্রিক আচরণে পরমাণু কেন্দ্রসহ অন্যান্য সাধারণ বেসামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বিরত থেকেছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ব্যাপক জটিলতা ও তিক্ততা স্বীকার করে নিয়েও তিনি পারমাণবিক কূটনীতির এই ক্ষেত্রটিকে এমন একটি জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখান থেকে বর্তমান বিশ্বের অনেক কিছু শেখার আছে।
এমন এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে বিভিন্ন যুদ্ধের কারণে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে, সেখানে এই ‘সংযমের ধারণাটি’ নতুন করে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব লাভ করছে।
ভারত-পাকিস্তান চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যকার কাশ্মীরসহ অন্যান্য সমস্ত রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করে দেয় না। এটি সীমান্ত সংঘাত বা দীর্ঘদিনের পারস্পরিক উত্তেজনাও পুরোপুরি দূর করে না। কিন্তু এটি অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে, চরম বৈরী সম্পর্কের মধ্যেও যদি সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক দূরদর্শী চুক্তি করা যায়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
রাফায়েল গ্রোসি পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা না করার যে ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বা ট্যাবু’র কথা বলেছেন, তা বর্তমান বিশ্বে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। তবুও দক্ষিণ এশিয়ার বুকে দুটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পারমাণবিক শক্তিধর দেশ সেই ট্যাবুটি কঠোরভাবে বজায় রেখে চলেছে। এটি বিশ্বকে এই বার্তাই মনে করিয়ে দেয় যে, সংযম ও নিয়ম নীতি যদি একবার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যায়, তবে তা ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।