সুইজারল্যান্ডকে ভূস্বর্গ বলা হয়। সেখানে পাহাড়ি উপত্যকায় স্নিগ্ধ-শ্যামল আবহাওয়ায় বায়ুপ্রবাহ প্রায় থেমে থাকে। ফলে সুইসরা নিখুঁত মাপে ঘড়ির যন্ত্রাংশ বানাতে পারে। সেরকম নিরাপদ কোনো উপত্যকায় শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করবেন।
সমঝোতা স্মারক কোনো চুক্তি নয়; বরং তা মোটাদাগে পারস্পরিক সদিচ্ছার প্রকাশ মাত্র। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার জায়গাটা দুর্বল। চার মাস আগে আমেরিকানরা ইরানের ওপর যে আগ্রাসী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, আশা করা যায় এই সমঝোতায় ওই যুদ্ধ বন্ধের রসদ থাকবে। যুদ্ধ চলেছে একশ দিনের বেশি সময় ধরে। যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা চলেছে এক মাসের বেশি সময়। এখন শোনা যাচ্ছে, সমঝোতা স্মারকে সদিচ্ছার পাশাপাশি ষাট দিনের একটা সময়সীমা থাকবে, যার মধ্যে দুই দেশ স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য বিবদমান বিষয়গুলো চূড়ান্তভাবে ফয়সালা করতে সচেষ্ট হবে। হয়তো তখন বড় আকারে এক বা একাধিক চুক্তি হতে পারে।
বিষয়গুলো কী কী? যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রথম শর্ত হলো হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ও অবাধ করা। হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সমস্যা নেই; কিন্তু এতে চীন ও ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর যেমন জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হবে, তেমন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর তেল রপ্তানি আটকে যাবে। ফলে মিত্রদের চাপ রক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার শর্ত তালিকার প্রথমদিকে রাখতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শর্ত ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে। মূলত এ ইস্যুতেই যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা চলছিল। তখন উভয়পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় ছিল বলে আলোচনা ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে ঘায়েল করা যাবে। কিন্তু একশ দিনের যুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে। পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে ইউরেনিয়ামকে নব্বই ভাগ বিদীর্ণ করার প্রয়োজন হলেও জ্বালানি বা অন্যান্য শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য তা চার-পাঁচ ভাগ বিদীর্ণ করলেই হয়। জানা গেছে, ইরান সেই বিদীর্ণ ক্ষমতা এরই মধ্যে ষাট ভাগে উন্নীত করে ফেলেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রকে এখন ইরানের মিসাইল সক্ষমতা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। কেননা ইরানের মিসাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র পৌঁছাতে পারে। ফলে ইসরায়েল থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের কেউই এখন আর ইরানের হাত থেকে নিরাপদ নয়। মিসাইলের পাশাপাশি ইসরায়েল এবং আরব মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সহযোগী শক্তিদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত ইরান যেন হিজবুল্লাহ, হুতি ও হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মদদ না দেয়।
অন্যদিকে ইরানের শর্ত মোটাদাগে তিনটি। এক. সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সশস্ত্র আক্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। এই শর্ত প্রধানত ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিরুদ্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত উনিশটি জায়গায় আমেরিকান সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে।
সমঝোতা স্মারক কোনো চুক্তি নয়; মোটাদাগে পারস্পরিক সদিচ্ছার প্রকাশ মাত্র। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার জায়গাটা দুর্বল। চার মাস আগে আমেরিকানরা ইরানের ওপর যে আগ্রাসী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, আশা করা যায় এ সমঝোতায় ওই যুদ্ধ বন্ধের রসদ থাকবে
দুই. ইরান তার ওপর দেওয়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করাতে চায় এবং ইরানের যেসব সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটক রাখা রয়েছে, তা ছাড় করাতে চায়। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা পোষাতে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চায়। তিন. এই ক্ষতিপূরণের জন্য ইরান বেছে নিয়েছে হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিকীকরণ। যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করবে, ইরান তাদের ওপর থেকে ফি আদায় করবে।
ইরানের তৃতীয় শর্তটি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ভয়াবহ। কার পাপে কে ভোগে? যুদ্ধে কোনোরূপ অংশ না নিয়ে, কোনোপক্ষকে সমর্থন না করে, শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি পণ্য আমদানি করার কারণে বাংলাদেশকে জাহাজপিছু এই অতিরিক্ত মাশুল দিতে হবে। চীনসহ বাংলাদেশের মতো আরও অনেক দেশ এই খড়গের নিচে। আশ্চর্য, কোনো দেশই আজ পর্যন্ত এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না।
প্রশ্ন হলো— সমঝোতা স্মারকে যেভাবেই লেখা থাকুক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কি চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হবে? ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও এটুকু বলা যায়, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে আগের চেয়ে বেশি জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান বা ইসরায়েলের যে কেউ শান্তি সমঝোতা ভেস্তে দিতে পারে। অক্টোবরের শেষে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরতে চান। সেজন্য তিনি এখন এমন কিছু করতে পারবেন না, যা তার ভোট কমিয়ে দিতে পারে। নেতানিয়াহুর বিরোধীরা এরই মধ্যে বলাবলি শুরু করেছেন, যুদ্ধে ইসরায়েল কিছুই পায়নি। এজন্য নেতানিয়াহু আরও বেশি যুদ্ধংদেহী ভাব দেখাতে মরিয়া। অর্থাৎ, নেতানিয়াহু একাই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা পণ্ড করতে যথেষ্ট। ইরান যদি সমঝোতায় গিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান না হয়— অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞা বাতিল না হয় বা আটকে রাখা সম্পদ ছাড় করা না হয়, তাহলে ইরানের দিক থেকে চূড়ান্ত সমঝোতায় অগ্রগতি হবে না। আবার ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচির সীমানা না মানে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সমঝোতায় যতি বা ইতি আসতে পারে।
তবু বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার সাফল্যে আশাবাদী। যুদ্ধে বিবদমান কারোরই ক্ষতি বই লাভ হয় না। যেমন— ইরানিরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রাখলে যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে অবরোধ অব্যাহত রাখবে। ফলে না ইরানের কোনো রপ্তানি হবে, না আরব দেশগুলোর কোনো রপ্তানি হবে। আর রপ্তানি বন্ধ হলে সারা বিশ্বই জ্বালানি সংকটে পড়বে।
বিশ্ব মোড়ল হতে হলে বহুমুখী সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চিন্তা করতে হয়, একইভাবে ন্যাটো মিত্রদের নিরাপত্তা এবং চীনের উত্থানের কথাও মাথায় রাখতে হয়। ইউক্রেন আক্রমণের মধ্য দিয়ে রাশিয়া পুরো ইউরোপকে হুমকির মধ্যে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপে ন্যাটো মিত্রদের পাশে না দাঁড়ায়, তবে তাদের মিত্রতা হারাবে। আবার দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানকে যদি কার্যকরভাবে নিরাপদ না রাখে, তবে চীনের ক্রমাগত উত্থানে যুক্তরাষ্ট্র আম-ছালাসহ নিজের মোড়লগিরি হারাবে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন কতটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ইরান যুদ্ধের একপর্যায়ে মনে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল এবং মিসাইল প্রতিরোধ রসদ হয়তো সীমিত হয়ে আসছে। সেজন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন হাত গোটাতে চাচ্ছে।
আর ট্রাম্পও নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত। ইসরায়েলিরা হয়তো এখন যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রীকে পছন্দ করতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে হয়তো ঠিক উল্টোটা হবে। সেজন্য ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের একটা সমঝোতা হলেই বিজয় হয়ে গেছে বলে ট্রাম্প ঢোল পেটাতে থাকবেন। তার ট্রুথ সোশ্যাল, তার বিশাল বড় মুখ, নির্বাচনের আগপর্যন্ত অমনভাবেই সরব থাকবেন। ভুলে যাবে, তিনি একবার একটা সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার দম্ভ দেখিয়েছিলেন। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন।
আমরা তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা প্রয়াস থেকে কী বার্তা পেলাম? সোভিয়েত ব্যবস্থার পতনের পর থেকে বিশ্ব যে এককেন্দ্রিক মোড়লপ্রথায় ঢুকেছিল, এর এখন পরিবর্তন শুরু হয়েছে। পরিবর্তনের সুযোগে ইরানের মতো মধ্যপন্থী দেশগুলো আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে নিজেদের নিয়ম আরোপ করতে পারে। গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা ভাবধারা পরাজিত হতে থাকবে। ভবিষ্যতের পৃথিবী যদি চীনের উত্থানের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে চলতে না পারে, তবে এই পরিবর্তনের সময়টা দীর্ঘায়িত হবে এবং তখন বিশ্বে অস্থিরতা চলতে থাকবে। অস্থির পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে জাতীয়ভাবে আমাদের ঐক্য ও সংহতি দরকার।