Image description

বৃষ্টি বা কালবৈশাখীর সামান্য ঝাপটাতেই রাজধানীর সড়কে গাছ উপড়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়। এতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর নজির যেমন আছে, তেমনি যানজটের ঘটনাও ঘটে।

গত ২৬ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন (টিএসসি) সড়কে একটি রাধাচূড়া গাছ পড়ে যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটায়। এছাড়া, ২০১৬ সালে ধানমন্ডির একটি সড়কের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে পড়ে খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী ও নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠু মারা যান।

উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুমে সড়কে গাছ উপড়ে পড়ার এমন ঘটনা বেশি ঘটে। শুধুই যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এমনটি হচ্ছে তা নয়, এর পেছনে মনুষ্যসৃষ্ট দায়ও আছে।

তাঁদের মতে, সৌন্দর্যবর্ধন ও দ্রুত বৃক্ষায়নের নামে সড়কের পাশে ও সড়কদ্বীপে ভুল প্রজাতির বিদেশি গাছ লাগানোই এর মূল কারণ। ঝুঁকিপূর্ণ গাছ সরানোর পাশাপাশি দেশীয়, শক্ত কাঠ ও মজবুত শেকড়যুক্ত গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একাধিক গবেষণায় ঢাকার বৃক্ষরোপণের ত্রুটি ও অপরিকল্পনার চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকার সড়কদ্বীপ, ফুটপাত ও পার্কগুলোতে দেশীয় প্রজাতির চেয়ে ভিনদেশি নরম কাঠের গাছের আধিক্য বেশি, যা এই শহরের মাটি ও পরিবেশের জন্য উপযোগী নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জায়গার প্রশস্ততা বুঝে গাছ নির্বাচন করা জরুরি। চওড়া সড়কদ্বীপে মাঝারি আকৃতির দেশীয় গাছ পলাশ, শিমুল, সোনালু, কদম, বকুল ও ছাতিম এবং সরু সড়কদ্বীপে দেশীয় গুল্মজাতীয় গাছ কুরচি, টগর, রঙ্গন ও ধাইফুল লাগানো যেতে পারে। এ ছাড়া যেকোনো বনায়ন প্রকল্পে শুধু ঠিকাদার বা প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর না করে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। বর্ষার আগেই গাছের ‘স্বাস্থ্য জরিপ’ করে দুর্বল বিদেশি গাছগুলো পর্যায়ক্রমে অপসারণ করে সেখানে দেশীয় গাছ লাগানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সড়কদ্বীপে ৫৬ শতাংশই বিদেশি গাছ

ঢাকা শহরের সড়কদ্বীপগুলোতে কী ধরনের গাছ রয়েছে, তা নিয়ে ২০২১ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব প্ল্যান্ট ট্যাক্সনমি’-তে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, ঢাকার সড়কদ্বীপে মোট ৯০ প্রজাতির গাছ রয়েছে, যার ৫৬ শতাংশই বিদেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাগানো হয়েছে মেহগনি, ইপিল-ইপিল, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস ও কৃষ্ণচূড়া।

গবেষক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, 'সড়কদ্বীপ বা ফুটপাতে আমরা না বুঝে দ্রুত বৃদ্ধির আশায় মেহগনি, ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো বিদেশি গাছ লাগিয়েছি। এগুলো মূলত নরম কাঠের গাছ। চারপাশের কংক্রিট ও পিচঢালা পথের কারণে এদের শিকড় মাটির গভীরে ছড়াতে পারে না। এর ওপর সেবা সংস্থাগুলোর অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে প্রধান শিকড় কাটা পড়ায় গাছগুলো ভারসাম্য হারায়। ফলে সামান্য ঝড়েই এগুলো উপড়ে পড়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।'

লেকপাড় ও উদ্যানের চিত্র

শুধু সড়কদ্বীপ নয়, ঢাকার লেকপাড় এবং পার্কগুলোর অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণায় ধানমন্ডি, হাতিরঝিল ও গুলশান লেকপাড়ের ২ হাজার ৩২২টি গাছের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, সেখানকার ৩৯ শতাংশ গাছ বিদেশি প্রজাতির। লেকপাড়ের শীর্ষ পাঁচটি গাছের মধ্যে তিনটিই বিদেশি—মেহগনি, আফ্রিকান মেহগনি (খায়া এনথোথেকা) এবং কৃষ্ণচূড়া। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব গাছের শেকড় অগভীর হওয়ায় বৃষ্টির দিনে মাটি নরম হলে এগুলো নিজের ভার ধরে রাখতে পারে না।

২০২৪ সালে প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায়, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সবুজ বলয়ে ১৫৬ প্রজাতির গাছের মধ্যে ৫১ শতাংশই বিদেশি। দূষণ কমানোর জন্য গাছ লাগানো হলেও ঢাকার মেহগনি গাছ বায়ুদূষণে নিজেই টিকতে পারছে না। ২০২৪ সালের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের প্রতি মেহগনি গাছ অত্যন্ত সংবেদনশীল। দূষিত বাতাসে এই গাছগুলো দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে, যা এদের উপড়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, 'মেহগনি বা ইউক্যালিপটাস আমাদের দেশীয় জীববৈচিত্র্যের কোনো উপকারে আসে না। মেহগনির ফলের বীজ পাখিরা খায় না। এমনকি প্রজাপতি বা কীটপতঙ্গেরও কোনো উপকারে আসে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গাছ লাগানোর বিষয়ে একটি জাতীয় কমিটি করা দরকার।'

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, 'আমাদের শক্ত প্রজাতির দেশীয় গাছ থাকা সত্ত্বেও আমরা বিদেশি গাছের দিকে ঝুঁকেছি। সিটি করপোরেশনে বৃক্ষবিদ্যাবিদের (আর্বোরিকালচারিস্ট) অভাব আছে। এজন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করে তদারকি জোরদার করতে হবে।'

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিবেশ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। নির্বাহী প্রকৌশলী ইশতিয়াক মাহমুদ বলেন, 'আমি কয়েক দিন হলো যোগদান করেছি, তাই কিছু বলতে পারছি না।'

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজীব খাদেম বলেন, তাঁদের একজন বিশেষজ্ঞ আছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন দেশীয় গাছ লাগানোর। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লোকবলের অভাব আছে বলে তিনি জানান।