পৃথিবীতে এমন অনেক শহর আছে, যেখানে মানুষের ভিড়ে হাঁটা দায়। আবার এমন শহরও আছে, যেখানে জনসংখ্যা এত কম যে সবাই সবাইকে নাম ধরে চেনে। কিন্তু এমন কোনো শহরের কথা কি শুনেছেন, যেখানে বাসিন্দা মাত্র একজন? অবিশ্বাস্য হলেও এমন শহর সত্যিই আছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের উত্তর প্রান্তে ছোট্ট এক শহর মনোওয়ি। শহর বললে অবশ্য অনেকেই অবাক হবেন। কারণ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন মাত্র একজন মানুষ। আর সেই মানুষটির নাম এলসি এইলার।
একসময় যেখানে দোকানপাট জমজমাট থাকত, শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকত স্কুল, রবিবার গির্জায় থাকত ভীড় সেখানে এখন দিনের বেশির ভাগ সময়ই শোনা যায় কেবল বাতাসের শব্দ। খোলা প্রেইরির ঘাস দুলে ওঠে, দূরে কোথাও গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে ওঠে, তারপর আবার নেমে আসে নিস্তব্ধতা।
সেই নিস্তব্ধ শহরের মেয়র, কোষাধ্যক্ষ, গ্রন্থাগারিক, সরাইখানার মালিক সবই একজন মানুষ। এলসি এইলার।
মনোওয়িতে এখন কার্যকর ভবন বলতে মূলত তিনটি—এলসির বাড়ি, সরাইখানা এবং একটি গ্রন্থাগার
শহরে ঢুকলেই দেখা মেলে তার
দক্ষিণ ডাকোটার সীমান্তের কাছাকাছি ধুলোমাখা সড়ক ধরে এগোতে থাকলে একসময় চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড, ‘মনোওয়ি, ১’। এটাই এখানকার জনসংখ্যা যে কেবল এক তার ইংগিত বহন করে।
সেখানে পৌঁছানোর পর খুব বেশি খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন হয় না। শহরের প্রাণকেন্দ্র বলতে একটি সরাইখানা। প্রায় সব দর্শনার্থী শেষ পর্যন্ত সেখানেই গিয়ে হাজির হন।
ভেতরে ঢুকলেই দেখা মিলতে পারে এলসি এইলারের। কখনো তিনি বার্গার ভাজছেন, কখনো কফি ঢালছেন, কখনো আবার দূরদেশ থেকে আসা কোনো পর্যটকের সঙ্গে গল্প করছেন।
আজ বিশ্বের নানা দেশের মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে। কিন্তু খ্যাতি নিয়ে খুব একটা ভাবেন না তিনি। বরং মনোওয়ির কথা বলতে বেশি ভালোবাসেন।
এখন শহরের পথ-ঘাট, দালানকোঠা সব ফাঁকা১৫০ থেকে ২, তারপর একজন
আজকের এই একাকী শহর একসময় ছিল বেশ ব্যস্ত। ১৯৩০-এর দশকে মনোওয়ির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০। শহরে ছিল মুদি দোকান, রেস্তোরাঁ, স্কুল, এমনকি ছোট্ট একটি কারাগারও। এলসি বড় হয়েছেন কাছের একটি খামারে। ছোটবেলার এক-কক্ষের স্কুলেই পরিচয় হয় রুডি এইলারের সঙ্গে। পরে দুজনের বিয়ে হয়। জীবনের বেশ কিছু সময় অন্যত্র কাটালেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা ফিরে আসেন মনোওয়িতেই।
১৯৭১ সালে দুজনে মিলে আবার চালু করেন পারিবারিক সরাইখানাটি। কিন্তু এর মধ্যেই বদলে যেতে শুরু করে আমেরিকার গ্রামীণ জীবন। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি দুর্বল হতে থাকে। তরুণেরা কাজের খোঁজে বড় শহরে চলে যেতে থাকে।
একের পর এক বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট। স্কুলে আর ছাত্র থাকে না। গির্জা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। জনসংখ্যা কমতে কমতে ২০০০ সালে দাঁড়ায় মাত্র দুইয়ে—রুডি ও এলসি।
তারপর ২০০৪ সালে রুডির মৃত্যু। সেই থেকে মনোওয়ির বাসিন্দা একজন।
দক্ষিণ ডাকোটার সীমান্তের কাছাকাছি ধুলোমাখা সড়ক ধরে এগোতে থাকলে একসময় চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড, ‘মনোওয়ি, ১’
মেয়র নির্বাচনে একমাত্র ভোটার
প্রতি বছর শহরটিকে প্রশাসনিকভাবে টিকিয়ে রাখতে নানা কাগজপত্র জমা দিতে হয়। মজার ব্যাপার হলো, মনোওয়ির মেয়র নির্বাচনও হয়।
ভোটার একজন। প্রার্থীও একজন। ফলাফলও অনুমিত।
এলসি নিজেই নিজের পক্ষে ভোট দেন এবং আবার মেয়র নির্বাচিত হন।
শুধু তাই নয়, শহরের বাজেট তৈরি করা, রাজ্যের কাছে উন্নয়ন পরিকল্পনা জমা দেওয়া, পানির ব্যবস্থা ও রাস্তার আলোর খরচের হিসাব রাখা—সব কাজই তাঁকেই করতে হয়। কার্যত একটি শহরের পুরো প্রশাসন একাই চালান তিনি।
মনোওয়ির মেয়রও এলসা
সরাইখানাই শহরের প্রাণ
মনোওয়িতে এখন কার্যকর ভবন বলতে মূলত তিনটি—এলসির বাড়ি, সরাইখানা এবং একটি গ্রন্থাগার। এর মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত জায়গা সরাইখানাটি।
সকালে দরজা খোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই আশপাশের খামার থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। কেউ কফি খেতে, কেউ আড্ডা দিতে, কেউবা কেবল এলসির সঙ্গে গল্প করতে।
অনেক পর্যটক শত শত মাইল দূর থেকেও আসেন। কেউ নেব্রাস্কার রাজধানী লিংকন থেকে, কেউ অন্য অঙ্গরাজ্য থেকে, আবার কেউ বিদেশ থেকেও।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এলসি বলেছিলেন, তাঁর কাছে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশ থেকে দর্শনার্থী এসেছে। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকেই মানুষ মনোওয়ি দেখতে এসেছে।
তার কাছে শহরটি কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটাই তার বাড়ি।
রুডির স্বপ্নের পাঠাগার
সরাইখানা থেকে একটু দূরেই আরেকটি ছোট ভবন। নাম—রুডিজ লাইব্রেরি।
রুডি এইলার ছিলেন বইপাগল মানুষ। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল প্রায় পাঁচ হাজার বই। মৃত্যুর পর সেই বইগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয় পাঠাগারটি।
আজও যার ইচ্ছা সেখানে গিয়ে বই পড়তে পারেন। চাবি থাকে এলসির কাছেই।
২০০৪ সালে এলসির স্বামী রুডির মৃত্যু হয়
একা, কিন্তু নিঃসঙ্গ নন
বাইরের দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষদের একজন এলসি এইলার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁর দুই সন্তান, নাতি-নাতনি, প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী আছে। আশপাশের ছোট শহরগুলো থেকে পরিচিত মানুষ প্রতিদিনই আসেন। সরাইখানার নিয়মিত অতিথিদের অনেককে তিনি শিশু বয়স থেকে চেনেন। এখন সেই শিশুদের সন্তানরাও আসে। তাই এলসি প্রায়ই বলেন, তিনি আসলে একা নন।
মনোওয়ির জনসংখ্যা হয়তো এক, কিন্তু তাঁর চারপাশে মানুষের অভাব নেই।
এখন কেমন আছেন এলসি?
২০২৩ সালে শেষ লিখেছিলাম এলসিকে নিয়ে। তিনি এখনো মনোওয়ি ছাড়েননি। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নব্বই পেরিয়েও তিনি এখনো শহরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। বয়সের ভার এসেছে, হাঁটাচলায় আগের তুলনায় ধীর হয়েছেন, কিন্তু সরাইখানার দরজা এখনো নিয়মিত খোলেন। দর্শনার্থীদের সঙ্গে গল্প করেন, খাবার পরিবেশন করেন এবং শহরের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজও দেখভাল করেন।
তবে তিনি জানেন, সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।
এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একদিন হয়তো তিনি আর সরাইখানায় দাঁড়াতে পারবেন না। তখন মনোওয়ির ভবিষ্যৎ কী হবে, তিনি জানেন না। কিন্তু তাঁর ইচ্ছে, শহরটি যেন পুরোপুরি হারিয়ে না যায়।
মনোওয়ির গির্জাদিনের শেষে
সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে মনোওয়িতে আবার নেমে আসে নিস্তব্ধতা। দর্শনার্থীরা ফিরে যান। গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যায় দূরে। সরাইখানার দরজায় তালা ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে নিজের ট্রেইলারের দিকে হাঁটেন এলসি এইলার।
তখন শহরের জনসংখ্যা আবার দাঁড়ায় একে। চারদিকে বাতাসে দুলতে থাকে প্রেইরির ঘাস।
আর পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত শহরগুলোর একটিতে, একজন নারী এখনো আগলে রাখেন তার স্মৃতি, তার মানুষগুলোকে, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকা এক শহরের অস্তিত্ব।
সূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস, নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, নেব্রাস্কা পাবলিক মিডিয়া, দ্য ইপক টাইমস