Image description

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হতে ভোটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস। মর্যাদাপূর্ণ এই পদের জন্য বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের পক্ষে দেশটির বহুপক্ষীয়তাবিষয়ক বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গোপন ব্যালটে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভোটে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জুটতে পারে সভাপতির চেয়ার, সেজন্য ভোটের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সংস্থাটির এক বছর মেয়াদের জন্য পরবর্তী সভাপতি নির্বাচনে আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদকক্ষে সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বিশেষ সমীকরণে এই ভোটের ফলাফল নির্ধারণ হতে পারে। সেটি হলো— ‘রেসিপোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ (একে অপরকে ভোট প্রদানের জন্য পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতামূলক চুক্তি)। এই পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি আদায়ে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের প্রার্থীর মধ্যে যিনি এগিয়ে থাকবেন, তারই ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মর্যাদাপূর্ণ সভাপতি পদে আগামীকাল সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের পক্ষে বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস লড়ছেন। মাত্র তিন মাসের প্রচারণায় বাংলাদেশ ‘গ্লোবাল সাউথ’ ও মুসলিম দেশগুলোর ভোট টানতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও, ১০ বছর ধরে প্রচারণা চালানো সাইপ্রাসের সঙ্গে বাংলাদেশের এই ভোটের লড়াই বেশ তীব্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে

লড়াইটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে জানিয়ে ঢাকা, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে কর্মরত বাংলাদেশের একাধিক কূটনীতিক ঢাকা পোস্টকে বলেছেন, বাংলাদেশ নাকি সাইপ্রাসের প্রার্থী জিতবেন, তা নিশ্চিত করে বলা দুরূহ। দুই প্রার্থীরই জেতার সামর্থ্য আছে এবং যে কেউ হতে পারেন ৮১তম অধিবেশনের নতুন সভাপতি। 

ভোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৬০টিরও বেশি ‘রেসিপোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্য থেকে হয়তো দু-চারটি ভোট হাতছাড়াও হতে পারে।

dhakapost
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান / ছবি- সংগৃহীত

আঞ্চলিক পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপের জন্য নির্ধারিত। বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস একই গ্রুপ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে; তবে সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও এর বিভিন্ন কমিটিতে নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বের সুবিধার্থে বৈশ্বিক সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো— আফ্রিকান গ্রুপ, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপ, পূর্ব ইউরোপীয় গ্রুপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় গ্রুপ এবং পশ্চিম ইউরোপীয় ও অন্যান্য গ্রুপ। 

পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে আফ্রিকান ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপে ভোটের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মাত্র তিন মাসের প্রচারণায় বাংলাদেশ নানা কূটনৈতিক কৌশলে আফ্রিকান ভোট টানার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান নিজেই সমর্থন চাইতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদরদপ্তর আদ্দিস আবাবা সফর করেছেন। শুধু তাই নয়, আফ্রিকার ভোট পেতে সেনেগাল এবং মরোক্কো সফর করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। প্রতিমন্ত্রী দুটি বহুপক্ষীয় ফোরামে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আফ্রিকান দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে খলিলুর রহমানের জন্য ভোট চেয়েছেন। 

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সেনেগাল এবং মরোক্কো সফরে প্রতিমন্ত্রী কয়েকটি ‘রেসিপোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ আদায়ে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া, আফ্রিকায় প্রভাব থাকা চীনকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে ঢাকা। গত এপ্রিলে বেইজিং সফর করে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদের জন্য আফ্রিকার দেশগুলোর ভোট পেতে চীনের সমর্থন চায় বাংলাদেশ। 

dhakapost
সাইপ্রাসের বহুপক্ষীয়তাবিষয়ক বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস / ঢাকা পোস্ট

সরকারের এক কূটনীতিক জানান, আফ্রিকান ভোট বাংলাদেশ পুরোপুরি পাবে না, কারণ সেখানে ভোট ভাগ হয়ে গেছে। তবে, শতাংশের হিসাবে বাংলাদেশের দিকেই পাল্লা ভারী। অন্য চারটি অঞ্চলের ভোটের পরিসংখ্যান সম্পর্কে এই কূটনীতিক আরও জানান, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দু-একটি দেশের ভোট বাংলাদেশ নাও পেতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এ বিষয়ে বিভক্ত, কারণ বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে সাইপ্রাসের সঙ্গে ‘রেসিপোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ করে ফেলেছে। তবে, মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম দেশগুলোর জোটের সমর্থন বাংলাদেশ বেশি পাবে। 

এছাড়া পূর্ব ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় এবং পশ্চিম ইউরোপীয় গ্রুপ থেকে দুই দেশের মধ্যেই ভোট ভাগাভাগি হবে। ইউরোপের অল্প কিছু ভোট বাংলাদেশও পাবে— জানান ওই কূটনীতিক। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতিসংঘের সভাপতি পদের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থী করা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে। তিনি ভোটে জিততে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। এই সময়ে তিনি সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য (লন্ডন), তুরস্ক, ভারত, চীন, মরিশাস, বেলজিয়াম, ইথিওপিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। এছাড়া তিনি ভোটের প্রচারণায় কয়েক দফা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন সফর করেছেন।

খলিলুর রহমানের জেতার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, আমাদের সমস্যা একটাই— আমরা প্রচারণার জন্য মাত্র তিন মাস সময় পেয়েছি। অন্যদিকে, সাইপ্রাস বিগত ১০ বছর ধরে এই পদের জন্য চেষ্টা করছে। তবে, ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে আরএসএ-এর ওপর। আরএসএ এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ বা ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে, যার প্রভাব ভোটে পড়বে বলে আমরা আশাবাদী। 

সরকারের আরেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, আমাদের প্রার্থী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি চমৎকার। গ্লোবাল সাউথ-এর সমর্থন, মুসলিম ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোট, শান্তিরক্ষা ও জলবায়ু কূটনীতিতে ইতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে বৃহৎ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। সবকিছুর ইতিবাচক প্রভাব ভোটে পড়তে পারে। 

dhakapost
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন / ফাইল ছবি

বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান বর্তমানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হলে তাকে সমানতালে দুটি দায়িত্ব সামলাতে হবে। ভোটের প্রচারণায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিপক্ষ সাইপ্রাসের প্রার্থী এটি নিয়ে নেতিবাচক প্রচার করছেন। তবে, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হলে ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন খলিলুর রহমান। এই লক্ষ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এক বছরের জন্য ছুটির আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।

 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান (৮০তম) অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। মঙ্গলবার (২ জুন) ভোটের মধ্য দিয়ে ৮১তম অধিবেশনের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হবেন। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এই অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। 

এর আগে, বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার খলিলুর রহমান নির্বাচিত হলে তিনি হবেন এই গৌরব অর্জনকারী দ্বিতীয় বাংলাদেশি। 

গোপন ব্যালটের এই নির্বাচনে জয়-পরাজয় মূলত নির্ধারিত হবে দেশ দুটির ‘পারস্পরিক ভোট প্রদান চুক্তি’ বা আরএসএ-এর সংখ্যার ওপর। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৬০টির বেশি দেশের সমর্থন আদায় করতে পেরেছে। নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে ১৯৮৬ সালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয় কোনো বাংলাদেশি হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের এই ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করবেন খলিলুর রহমান

যেভাবে প্রার্থী হলেন খলিলুর রহমান

২০২০ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এই পদে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ২০২৬ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছিল। তবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস ছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি থাকায় ঢাকা তখন কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করে। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয় খলিলুর রহমানকে, যিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রার্থী পরিবর্তন করে খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় এবং তৌহিদ হোসেন বাদ পড়েন। এর মধ্যে ফিলিস্তিনও নির্বাচন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় মঙ্গলবারের (২ জুন) নির্বাচনে এখন মুখোমুখি সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে।