Image description

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেইজিংয়ে সামরিক ব্যান্ড, সম্মান গার্ড ও চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা নাড়ানো তরুণদের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানোর কয়েকদিন পর একই ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনেই চীনে পৌঁছান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দুই নেতার সফরের আনুষ্ঠানিকতায় ছিল স্পষ্ট মিল, যা অনেকের মতে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক বার্তা—চীন একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম।

তবে এই মিলের মধ্যেও সূক্ষ্ম পার্থক্য রেখেছে চীন। ট্রাম্পকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট, যিনি মূলত আনুষ্ঠানিক পদে রয়েছেন। অন্যদিকে পুতিনকে অভ্যর্থনা জানান কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর একজন সদস্য, যা ইঙ্গিত দেয়—বেইজিং মস্কোকে কেবল অংশীদার নয়, বরং উদীয়মান অ-পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকেও এই তুলনা নিয়ে অস্বস্তি দেখা যায়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, দুই সফরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। তবে রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ভিন্ন সুর শোনা যায়। ‘আর্গুমেন্তি ই ফাক্তি’ পত্রিকা লিখেছে, পুতিনকে “বিশ্বস্ত মিত্র” হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, আর ট্রাম্পকে দেখা হয়েছে “প্রতিদ্বন্দ্বী ও অনিশ্চিত অংশীদার” হিসেবে।

দুই সফরের জাঁকজমক থাকলেও বাস্তব ফলাফল ছিল সীমিত। ট্রাম্প ও শি জিনপিং সহযোগিতার বার্তা দিলেও এনভিডিয়া চিপ রপ্তানি, শুল্কসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

অন্যদিকে পুতিনের সফরের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্বল অর্থনীতির চাপে রাশিয়া বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও রুশ বাহিনী বড় ধরনের অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ফলে মস্কোর ওপর বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতার কারণে রাশিয়া নিজেকে চীনের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকা “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২” গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে অগ্রগতির আশা করেছিল মস্কো। তবে বৈঠকের পর এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।

শি জিনপিং ও পুতিন কেবল জ্বালানি ও বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সাধারণ প্রতিশ্রুতি দেন। পরে পেসকভ স্বীকার করেন, প্রকল্পটির বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনও নির্ধারিত হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক লাভ হয়েছে শি জিনপিংয়ের। একই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্টকে রাষ্ট্রীয় সফরে আতিথ্য দিয়ে তিনি নিজেকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ট্রাম্পের সফরের সময় শি তাকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্র ঝংনানহাইয়ে আমন্ত্রণ জানান, যেখানে বিদেশি নেতাদের খুব কমই নেওয়া হয়। সেখানে শি ইঙ্গিত দেন, পুতিনও এই বিশেষ সম্মান পাওয়া নেতাদের একজন।

পরে পুতিনের সঙ্গে যৌথ উপস্থিতিতে শি বলেন, “চীন-রাশিয়া সম্পর্ক এখন বড় শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্কের মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।”

তবে দুই বৈঠকেই বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি যুদ্ধ—ইউক্রেন সংকট ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি—নিয়ে কোনো বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

চীন এখনো ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। বরং বেইজিং এমন অবস্থান বজায় রেখেছে, যাতে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে দুর্বল মস্কোর কাছ থেকে আরও সুবিধাজনক অর্থনৈতিক শর্ত আদায় করা যায়।